ভয়াবহ রূপে ডেঙ্গু: একদিনে ৯ মৃত্যু, সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড

২৪ ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যু ও এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি— চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন পার করল বাংলাদেশ।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একদিনে আরও নয়জনের মৃত্যু ও এক হাজার ৪২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে চলতি বছরের সবচেয়ে মারাত্মক দিনটি পার করল বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ নিয়ে ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে।

রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু

গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব নয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে সাতজনই ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। উত্তর সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। রাজধানীই এখনও ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু, যদিও এখন তা দেশের প্রায় সব বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে।

আক্রান্তের রেকর্ড ভাঙছে প্রতিদিন

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও একদিনে সর্বোচ্চ ছুঁয়েছে— এক হাজার ৪২ জন। শুধু ঢাকা বিভাগেই ভর্তি হয়েছেন ২০১ জন। এরপরই বরিশাল বিভাগে ১৯৫, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৮, দক্ষিণে ১২১, চট্টগ্রামে ১০৪, রাজশাহীতে ৮২, খুলনায় ৭২, ময়মনসিংহে ৪১, রংপুরে ২৩ ও সিলেটে ৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৪৯ হাজার ৯০৭ জন ডেঙ্গু রোগী।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঢাকায়

চলতি বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়— ১০২ জন। এরপর বরিশাল বিভাগে ৩২ জন, ঢাকা উত্তর সিটিতে ২৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫ জন, রাজশাহীতে ১০ জন, ময়মনসিংহে ৭ জন, খুলনায় ৫ জন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য অঞ্চলে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি নয়, বরং সারাবছরের সমস্যা হয়ে উঠছে। এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এ সংকটকে গভীর করছে।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২০২৫ সালের সংক্রমণ শুরু হয়েছে আগেভাগে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে— জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও এই রোগের বিস্তার বাড়ছে।

২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু ও ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবারও সেই ভয়াবহতা ফিরে আসার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

হাসপাতালে চাপ, চিকিৎসকদের সতর্কতা

রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে এখন প্রতিদিনই ভর্তি বাড়ছে। ডাক্তাররা বলছেন, অনেক রোগী হাসপাতালে আসছেন দেরিতে, যখন রোগ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়— ফলে মৃত্যু এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ মৃত্যু ঘটছে ভর্তি হওয়ার একদিনের মধ্যেই।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বর দেখা দিলেই দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করতে হবে, শরীরে পর্যাপ্ত তরল রাখতে হবে, আর কোনোভাবেই নিজের ইচ্ছায় ওষুধ সেবন বা চিকিৎসা বিলম্ব করা যাবে না।

প্রতিরোধই একমাত্র উপায়

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ড্রেন পরিষ্কার, জমে থাকা পানির উৎস ধ্বংস, ও ঘরে-বাইরে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সংযোগ তৈরি না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু ঢাকায় নয়, বরং বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড, রক্ত ও স্যালাইনের ঘাটতিও স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই বার্ষিক সংকট এখন শুধু একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ নীতি ও নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

spot_img