বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকারের অনেক উপদেষ্টা নিজেদের ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের পরিকল্পনা করছেন। একইসঙ্গে অনেকে নাকি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছেন।
সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাহিদ বলেন, “আমরা অনেক উপদেষ্টাকে বিশ্বাস করেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। তাদের অনেকে আন্দোলনের চেতনা ভুলে গিয়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন, কেউ কেউ অন্য দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন। সময় হলে তাদের নামও আমরা প্রকাশ করব।”
উপদেষ্টাদের ‘সেফ এক্সিট’ ভাবনা
নাহিদের ভাষায়, “অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টা নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার চিন্তা করছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই নিজেদের পথ পরিষ্কার করে নিয়েছেন।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “যারা গণঅভ্যুত্থানের সময় সামনে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন সরকারে গিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থেকে সরে গেছেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদের এই মন্তব্য সরকারের ভেতরকার অবিশ্বাস ও বিভাজনের চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কেউ কেউ এটিকে তরুণ নেতৃত্বের ‘ক্ষমতা পুনর্গঠন প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন; আবার অন্যদের মতে, এই বক্তব্য আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতারই প্রতিফলন।
‘ভুল ছিল উপদেষ্টা নিয়োগ’
সাক্ষাৎকারে নাহিদ স্বীকার করেন যে উপদেষ্টাদের নিয়োগ ছিল “একটি বড় ভুল।” তার মতে, নাগরিক সমাজ বা তথাকথিত সুশীলদের ওপর আস্থা রেখে আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “আমাদের উচিত ছিল ছাত্রনেতৃত্বকে শক্তিশালী করা, বাইরে থেকে কাউকে এনে সরকারে বসানো নয়। আন্দোলনের নেতৃত্বের শক্তি যদি সরকারে না থাকত, তাহলে এই সরকার তিন মাসও টিকত না।”
সরকারের ভেতরে অস্থিরতা ও দায়সারাপনা
নাহিদ সরাসরি কারও নাম না নিলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে শিক্ষা উপদেষ্টাসহ কয়েকজন দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। তিনি আগেও অভিযোগ করেছিলেন, সরকারের কিছু উপদেষ্টা সহকর্মী উপদেষ্টাদের ওপর হামলার ঘটনায় নীরব থেকেছেন—বিশেষ করে তথ্যমন্ত্রী মাহফুজ আলমের ওপর হামলার পর।
এমন বক্তব্যে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে ক্ষমতার ভেতরকার সম্পর্ক দিন দিন তিক্ত হয়ে উঠছে, তাতে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
প্রেক্ষাপট: নাহিদ, এনসিপি ও ছাত্র আন্দোলনের উত্তরাধিকার
মাত্র ২৭ বছর বয়সে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্বে উঠে আসেন নাহিদ ইসলাম। ওই আন্দোলনের মাধ্যমেই শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা হারায় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে।
প্রথম দিকে নাহিদও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধান করতেন। তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করে গঠন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
ইউনুসের বক্তব্য ও বিতর্ক
২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, “বাংলাদেশে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেটি ছিল সুপরিকল্পিত।” তিনি অনুষ্ঠানে আন্দোলনের তিনজন তরুণ নেতাকে ‘বিপ্লবের নায়ক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
ইউনুস বলেন, “এটা হঠাৎ করে ঘটেনি, এটি পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছিল। এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল নেতৃত্ব যেন কেউ সহজে চিনে ফেলতে না পারে।”
ওই তিনজনের একজন হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আলম বর্তমানে সরকারের তথ্যমন্ত্রী। সংবাদমাধ্যমগুলো আগে অভিযোগ করেছিল, মাহফুজ আলমের সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরিরের যোগাযোগ রয়েছে—যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ইউনুসের এই বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ছাত্র আন্দোলনের নামে সংগঠিত এই পরিবর্তনের পেছনে আদতে কারা ছিল, এবং কীভাবে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো এতে যুক্ত হলো।
সামনে কী?
নাহিদের হুঁশিয়ারি, তিনি শিগগিরই সেই উপদেষ্টাদের নাম প্রকাশ করবেন, যারা নিজেদের ‘সেফ এক্সিট’ পরিকল্পনা করছেন। এই ঘোষণা নতুন এক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি তিনি সত্যিই নাম প্রকাশ করেন, তাহলে সরকারের অভ্যন্তরে বিভাজন আরও গভীর হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে, এনসিপির জন্য এটি রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার সুযোগও হতে পারে। কারণ নাহিদের দল নিজেকে এখন ছাত্র আন্দোলনের আদর্শ ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
সব মিলিয়ে, নাহিদের ‘সেফ এক্সিট’ অভিযোগ শুধু একটি বক্তব্য নয়—এটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার নতুন অধ্যায়। যেখানে একই সরকারের ভেতরে থাকা সাবেক সহযোগীরাই এখন একে অপরের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন।

