“ইসরায়েল-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্কের সদস্য” হিসেবে অভিযুক্ত দেখিয়ে ছয়জন ব্যক্তিকে শনিবার ভোরে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে ইরান সরকার।
কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ও অভিবাসী ইরানি সংগঠনগুলো বলছে, এই ছয়জন আসলে রাজনৈতিক বন্দী ও খুজেস্তানের আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারকর্মী—যাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল অস্বচ্ছ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অভিযোগের পেছনের গল্প
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা মিজান জানায়, অভিযুক্তরা খুজেস্তান প্রদেশে “রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা” ও “বিস্ফোরণ ও হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে” জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে চারজন নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যার, গ্যাস স্টেশনে বিস্ফোরণ ঘটানোর, ব্যাংক ও সামরিক কেন্দ্র আক্রমণের অভিযোগ আনা হয়।
বিচার বিভাগ বলেছে, এই ছয়জন তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে এবং আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেছে।
কিন্তু অধিকারকর্মীদের দাবি—এই স্বীকারোক্তিগুলো ছিল জোরপূর্বক আদায় করা। বন্দীদের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি, বিচার প্রক্রিয়া হয়েছে গোপনে, এমনকি পরিবারকেও জানানো হয়নি কখন ফাঁসি কার্যকর হবে।
খুজেস্তান: অস্থিরতার কেন্দ্র
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশ তেলসমৃদ্ধ হলেও আরব সংখ্যালঘুদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈষম্যের প্রতীক। স্থানীয়দের অভিযোগ—তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়, শিক্ষা ও প্রশাসনে সুযোগ সীমিত, এমনকি আরবি ভাষার ব্যবহারেও রয়েছে সরকারি বাধা।
এই বৈষম্যের প্রতিবাদে কয়েক বছর ধরে এলাকাটিতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন ও বিক্ষোভ দমন করতে সরকার বারবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
ইরানি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, সরকার খুজেস্তানের আরব অধিকারকর্মীদের “বিচ্ছিন্নতাবাদী” বা “বিদেশি গুপ্তচর” আখ্যা দিয়ে ভয় দেখায়। “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ এনে তাদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইরান হিউম্যান রাইটস (IHR) সংস্থা বলছে, ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক বন্দীদের ফাঁসির হার দ্রুত বেড়েছে। প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক বিরোধী বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের রাষ্ট্রদ্রোহ বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদক জাভায়েদ রহমান বলেছেন, “ইরানে বিচারব্যবস্থা ক্রমেই অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে। অভিযোগ প্রমাণের আগে মানুষকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে, যা কার্যত রাষ্ট্রীয় হত্যার শামিল।”
অ্যামনেস্টির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই ছয়জনের ফাঁসি আবারও প্রমাণ করল, ইরান তার ভিন্নমতাবলম্বীদের চুপ করাতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”
রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
ফাঁসির ঘটনাটি ঘটল এমন এক সময়ে, যখন ইরান-ইসরায়েল সম্পর্ক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। গত কয়েক মাসে ইরান দাবি করেছে, দেশটির ভেতরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বেশ কিছু নাশকতা হয়েছে। তারই জের ধরে সরকার “অভ্যন্তরীণ গুপ্তচর ও দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই মৃত্যুদণ্ড আসলে রাজনৈতিক বার্তা। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত সরকার দেখাতে চায়, “দেশবিরোধীদের” প্রতি তারা কঠোর।
তবে এই কঠোরতা দেশের ভেতরেই ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরান সরকারের এই পদক্ষেপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের কয়েকজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ইরান যেন অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার স্থগিত করে এবং সব নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পুনর্বিচার করে।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক মন্তব্য করেছেন, “যখন আদালত সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয় না, অভিযুক্তদের পরিবারকে জানায় না, এবং রায় প্রকাশ্যে পড়ে না—তখন বোঝা যায় এটি বিচার নয়, এটি প্রতিশোধ।”
‘সন্ত্রাসী’ না ‘রাজনৈতিক বন্দী’?
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম যাদের “সন্ত্রাসী” বলছে, তাদের পরিবারের কাছে তারা ছিলেন সমাজকর্মী, শিক্ষক, ও শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য।
খুজেস্তানের অনেক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন—“তারা আমাদের মতোই মানুষ ছিল, যারা ন্যায়বিচার চেয়েছিল।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের নিরাপত্তা-রাজনীতি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই কেউ সহজেই “বিদেশি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত” হিসেবে অভিযুক্ত হতে পারে।

