খাগড়াছড়ি সহিংসতায় ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলো নয়াদিল্লি

ভারত বলেছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে দোষ চাপাচ্ছে অন্যের ঘাড়ে।

ভারত শুক্রবার ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাম্প্রতিক অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অভিযোগ করেছিলেন যে খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক সহিংসতার নেপথ্যে নাকি ভারত এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। এর পরই নয়াদিল্লি কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়।

ভারতের পাল্টা বক্তব্য

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রন্ধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা এসব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ এবং তারা প্রায়শই দোষ চাপানোর জন্য অন্যের দিকে আঙুল তোলে।”

তিনি ঢাকাকে পরামর্শ দেন স্থানীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালাতে—যারা পাহাড়ি এলাকায় সংখ্যালঘু আদিবাসীদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ভূমি দখলের মতো অপরাধ চালাচ্ছে।

খাগড়াছড়ির সহিংসতার প্রেক্ষাপট

গত ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে এক মারমা কিশোরীর ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি বসতিদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হন। আহতদের মধ্যে সেনা সদস্য ও পুলিশও রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে, তবে থেমে থেমে হামলা ও ভীতির কারণে স্থানীয়রা ঘরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।

কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ভারতের ভূমিকার সমালোচনা করছে, যদিও কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া আসলো এমন এক সময়ে যখন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। খাগড়াছড়ির সহিংসতার পর দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনের সময় জেনেভায় “ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সেক্যুলার বাংলাদেশ” একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে সংখ্যালঘু নির্যাতন, উগ্র মৌলবাদ, সংবাদমাধ্যম দমন, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইউনুস জাতিসংঘ অধিবেশনের এক আলোচনায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঐক্য পরিষদ এটিকে “সত্য অস্বীকার” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

সামনে পথ

খাগড়াছড়ির সহিংসতা শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারত বলেছে, ঢাকার উচিত বাইরের দিকে অভিযোগ না তুলে ভেতরের সমস্যা সমাধান করা।

এদিকে চলমান দুর্গাপূজা উৎসবকে ঘিরে নতুন করে কোনো সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে কিনা—সে আশঙ্কায় পুরো চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস এলাকায় উদ্বেগ বিরাজ করছে।

spot_img