ধর্ষণ মামলায় আদালতে নেওয়া হলো শিবির নেতা জিসানকে

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করার পর আদালতে হাজির করা হয়; মামলার অন্য তিন আসামি ইতোমধ্যে কারাগারে, দুজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্য জানিয়েছে পুলিশ

ঢাকা, ১৭ জুন — কুমিল্লার দাউদকান্দীতে এক বিধবাকে ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে হাসপাতাল থেকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিতর্কের পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করলে আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, জিসান এতদিন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। মঙ্গলবার চিকিৎসকদের ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাঁকে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হয়। দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এ. বারী গণমাধ্যমকে বলেন, “ডাক্তারদের ছাড়পত্র পাওয়ার পর জিসানকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে। তিনি হাসপাতালেই ডিবি পুলিশের হেফাজতে ছিলেন।”

স্বাস্থ্য নিয়ে বিতর্ক, মেডিকেল বোর্ডের তদন্ত

জিসান গ্রেপ্তারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি সত্যিই অসুস্থ নাকি আদালতে হাজিরা এড়াতে অসুস্থতার নাটক করছেন—এ নিয়ে জনমনে আলোচনা শুরু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। বোর্ডের নেতৃত্বে ছিলেন হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হেলালুর রহমান।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান আগেই বলেছিলেন, “যদি তিনি সুস্থ থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতার ভান করে থাকেন, তাহলে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।” পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষে মেডিকেল বোর্ড জিসানকে সুস্থ বলে মত দেয় এবং তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

ফেসবুকে পরিচয়, পরে সম্পর্ক

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকের মাধ্যমে জিসান মিয়া প্রধানের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জিসান ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরে ওই নারী গর্ভবতী হলে তাঁকে জোর করে গর্ভপাত করানো হয়।

পুলিশের দাবি, পরবর্তীতে ওই নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত গত ১১ জুন রাতে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ডায়েরিও করা হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, বিয়ের চাপের মুখে জিসান আত্মগোপনে চলে যায়। নিখোঁজ হওয়ার যে ঘটনা প্রচার করা হয়েছিল, সেটি মূলত বিয়ে এড়ানোর একটি কৌশল ছিল বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।”

অচেতন অবস্থায় উদ্ধার, পরে মামলা

গত শুক্রবার রাতে লক্ষ্মীপুর-লাকসাম রেল জংশন এলাকায় জিসানকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ওই রাতেই ভুক্তভোগী নারী দাউদকান্দি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় জিসানকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া ধর্ষণে সহায়তা, জোরপূর্বক গর্ভপাত এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে আরও তিনজনকে আসামি করা হয়।

পরে পুলিশ তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় এবং হাসপাতালেই পুলিশি পাহারায় রাখা হয়।

আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা

মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে কুমিল্লার একটি আদালত ভুক্তভোগীর নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) ইমাম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আদালত ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

শিবিরের পদ হারান জিসান

জিসান মিয়া প্রধান ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সংগঠনটির কুমিল্লা পশ্চিম জেলা শাখার সাবেক সভাপতি। মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের পর ছাত্রশিবির তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে।

সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগকারীর সঙ্গে জিসানের ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীর আইনি সহায়তায় পাশে থাকার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

অন্য আসামিদের অবস্থান

দাউদকান্দি থানার ওসি মো. এ. বারী জানিয়েছেন, মামলার অন্য তিন আসামি—সেকান্দার আলী, গোলাম রাব্বী ও সাজিব—ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলেও পুলিশ দাবি করেছে।

মামলাটি বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধ মামলায় পরিণত হয়েছে। কারণ এতে শুধু একজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগই নয়, বরং তাঁর কথিত নিখোঁজ হওয়া, হাসপাতালে ভর্তি থাকা এবং শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে বিতর্কও যুক্ত হয়েছে। আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা এবং চলমান তদন্তের ফলাফল এখন মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

spot_img