যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত “রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট”-এর পূর্ণাঙ্গ আইনি পাঠ যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রকাশের পর এর বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী উপাদানগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে। চুক্তির অপ্রকাশিত বিষয়গুলো নিয়ে আছে অজানা আশঙ্কা। অর্থনীতিবিদ, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারক মহলে চুক্তির শর্তাবলি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (USTR) দপ্তর চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করে । এতে শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত নানা বাধ্যবাধকতা তুলে ধরা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস শুরুতে এই চুক্তিকে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও, পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের পর এর বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশ নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তা কার্যকর হবে। এতে বলা হয়েছে: “এই চুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন উভয় পক্ষ লিখিতভাবে নিশ্চিত করবে যে তারা তাদের নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, এবং সেই বিনিময়ের ৬০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর হবে।”
এখন পর্যন্ত এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি, ফলে চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি।
শুল্ক কাঠামোতে বৈষম্যের অভিযোগ
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দিতে হবে। এতে বলা হয়েছে: “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য কর হ্রাস বা প্রত্যাহার করবে, চুক্তির তফসিল অনুযায়ী।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে: “যুক্তরাষ্ট্র তার বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো বজায় রাখবে, যদি না তফসিলে ভিন্নভাবে উল্লেখ থাকে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই কাঠামোটি অসম এবং একতরফা সুবিধা প্রদান করে।
২০২৬ সালের ১০ মার্চ ঢাকায় এক ব্রিফিংয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে পারে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এতে দেশের আর্থিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
দেশীয় শিল্প নীতিতে সীমাবদ্ধতা
চুক্তিতে “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বা সমান আচরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে: “যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যকে বাংলাদেশ নিজ দেশের পণ্যের মতোই সমান সুবিধা প্রদান করবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এতে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত স্বাধীনতা কমে যেতে পারে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে চাপ
চুক্তিতে কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়ে বলা হয়েছে: “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য—যেমন মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও শস্য—বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।”
এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড স্বীকৃতির কথাও উল্লেখ রয়েছে। এতে দেশের গবাদিপশু ও দুগ্ধখাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
মেধাস্বত্ব আইনে পরিবর্তনের চাপ
চুক্তিতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইন কঠোর করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের বিদ্যমান সুবিধা সীমিত হতে পারে।
বিরোধ নিষ্পত্তি ও একতরফা ব্যবস্থা
চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, কোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে অন্য পক্ষ সুবিধা স্থগিত করতে পারবে।
এছাড়া “জাতীয় নিরাপত্তা”-র অজুহাতে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
সাবেক উপদেষ্টাদের প্রতিক্রিয়া
চুক্তিটি এতটাই দেশের স্বার্থবিরোধী যে এ নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তারা এর দায় ইউনুসের ওপর চাপাচ্ছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন: “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার কোনো বৈঠকেই আমাকে ডাকা হয়নি।”
সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ১৪ মার্চ ২০২৬ রাজধানীর পান্থপথে এক গোলটেবিল আলোচনায় বলেন: “জাতীয় স্বার্থবিরোধী জেনেও আমি ভেতর থেকে এই চুক্তি ঠেকাতে পারিনি।”
তার মতে, “এই চুক্তির মাধ্যমে মাংসসহ অনেক দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।”
এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন: “চুক্তি নির্বাচনের তিন দিন আগে হয়েছে—এমনটা ভাবা ভুল। এটি আগে থেকেই চলছিল… নন-ডিসক্লোজার (অপ্রকাশিত) চুক্তির কারণে সরকারের ভেতরের লোকজনও সব জানতে পারেননি।”
জনমত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
চুক্তিটি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে অপসারণ করে অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তারাও অনেকে এই চুক্তির সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন: “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
তার মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে “হাত-পা বাঁধা অবস্থায়” ফেলে দেওয়া হয়েছে।
১৩ মার্চ ২০২৬ বিজয়নগরে এক সেমিনারে তিনি বলেন, “আমরা যেটা দেখছি—সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার।”
ইউনুস আমলে চুক্তি স্বাক্ষরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা খলিলুর রহমানের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ ধরনের দেশবিরোধী চুক্তিকে যিনি ভালো বলেন, তিনি এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী—এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।”
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই সময় থেকেই প্রশাসনিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য চুক্তিটি এখন অর্থনৈতিক নীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা
চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। তবে এটি কার্যকর হবে কি না, নাকি পুনর্বিবেচনা করা হবে—তা নিয়ে আগামী সময়েই সিদ্ধান্ত হবে।
পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের ফলে এখন চুক্তির বাস্তব শর্তগুলো সামনে এসেছে, যা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা ও সমালোচনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

