ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথে রচিত হয় নতুন ইতিহাস

আজ ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এটি এক স্মৃতি-বিজড়িত ও গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমান মুজিবনগর) আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত ও আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান করে তোলে।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলেও, ঠিক ২১৪ বছর পর ১৯৭১ সালের এই দিনে আরেকটি আম্রকাননে উদিত হয় স্বাধীনতার লাল সূর্য। দীর্ঘ শাসন-শোষণ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের পর বাঙালি জাতি নতুন করে জেগে ওঠে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী মন্ত্রিসভা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে গঠিত হয় এই সরকার। সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

সেদিন সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে মুক্ত আকাশের নিচে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চে শুরু হয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক এই মুহূর্ত ধারণ করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মগ্রন্থ পাঠের পর গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’। এরপর অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সেনাবাহিনী প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উত্তোলন করেন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

সরকারে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, এএইচএম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ আইন, বিচার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। জেনারেল এমএজি ওসমানী সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় মাত্র ৪৫ মিনিট স্থায়ী হয় পুরো অনুষ্ঠান। এরপর মুক্তিযোদ্ধা ও আনসার সদস্যরা নবগঠিত সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

মুজিবনগর সরকারের এই শপথ ছিল মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন মাত্রা পায় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ সুগম হয়।

পরবর্তীতে এই সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাঙালি জাতি অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

ঐতিহাসিক এই দিনটি আজ ‘মুজিবনগর দিবস’ হিসেবে সারা দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles