আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের চ্যালেঞ্জে হাসিনার ‘রাজনৈতিক বিচার’

আইসিটি রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনজীবীদের চিঠি; পক্ষপাত, ন্যায্য বিচার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) প্রদত্ত রায়কে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাঁর আইনজীবীরা একটি বিস্তারিত আইনি চিঠির মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে ‘অবৈধ, পক্ষপাতদুষ্ট ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডবিরোধী’ বলে অভিযোগ তুলেছেন, যা দেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে ঢাকার আইসিটির উদ্দেশ্যে পাঠানো ১০ পৃষ্ঠার ওই চিঠিতে শেখ হাসিনার পক্ষে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাদের দাবি, এই বিচার ছিল “ন্যায্যতা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মৌলিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ” এবং এর ফলে যে রায় ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা আইনগতভাবে টেকসই নয়।

চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা এই বিচারকে বৈধ হিসেবে স্বীকার করেন না এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এই রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেছেন।

বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

আইনজীবীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিরপেক্ষতা। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইসিটির বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হয় এবং সেখানে এমন বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অক্টোবর ২০২৪-এ দ্রুতগতিতে নতুন বিচারক নিয়োগ এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন বেঞ্চ গঠনের বিষয়টি বিচারিক স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিচার চলাকালে একজন বিচারকের মন্তব্য—“আপনারা আপনার ক্লায়েন্টকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন”—এই ধারণা তৈরি করে যে রায় আগেই নির্ধারিত ছিল। এমন মন্তব্য বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করে।

প্রসিকিউশনের পক্ষপাতের অভিযোগ

চিঠিতে প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়, প্রধান কৌঁসুলি রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিচার চলাকালেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।

বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে এক রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান—যখন একই সময়ে তিনি ওই দলের নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছিলেন।

⇒ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনার আইনজীবীদের পাঠানো চিঠির পিডিএফ

এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “এই আন্দোলন সফল করতে যারা ভূমিকা রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা হয়রানি করা হবে না।”

আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের অবস্থান বিচার ব্যবস্থায় একপাক্ষিকতা তৈরি করে, যেখানে একদলকে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, অন্যদিকে আরেকদলকে দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।

ন্যায্য বিচারের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

চিঠির সবচেয়ে গুরুতর অংশে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়নি, এমনকি মামলার নথিপত্র বা প্রমাণও সরবরাহ করা হয়নি। ফলে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পাননি।

এতে বলা হয়, তাঁকে এমন একজন আইনজীবী দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করানো হয়েছে, যার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং যাকে তিনি কোনো নির্দেশনাও দেননি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের মানবাধিকার শাখার পরিচালক ব্যারোনেস হেলেনা কেনেডি বলেন,
“বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন,
“এই বিচার ও রায়—কোনোটিই ন্যায়সঙ্গত বা গ্রহণযোগ্য নয়।”

অনুপস্থিতিতে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড

শেখ হাসিনার বিচার অনুপস্থিতিতে (in absentia) পরিচালিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত। তবে আইনজীবীদের মতে, এই ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো মানা হয়নি।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, একই সময়ে তাঁকে ভারতে থেকে ফেরানোর জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—যা প্রমাণ করে যে তাঁর অনুপস্থিতি স্বেচ্ছায় ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে এবং এটিকে “summary execution” বা বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য বলা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন

আইনজীবীরা আরও দাবি করেছেন, আইসিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ বিচার করা। কিন্তু ২০২৪ সালে আইনে পরিবর্তন এনে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাকে এর আওতায় আনা হয়েছে, যা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তাদের মতে, এই ধরনের অভিযোগ সাধারণ ফৌজদারি আদালতেই বিচার হওয়া উচিত ছিল, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নয়।

বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই আইনি চ্যালেঞ্জ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার অভিযোগ বাড়ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর সহিংসতায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর বহু হামলার ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে এবং বিচারব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

দাবি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

চিঠির শেষে আইনজীবীরা কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে—রায় বাতিল করা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা।

এছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আইসিটিকে ১৪ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দিতে বলা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি দ্রুতই আরও বড় আইনি ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রূপ নিতে পারে।

সামনে কী

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছুই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

একদিকে সরকার এই বিচারকে ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এটিকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে।

ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু একটি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের আইনশাসন, বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি বড় পরীক্ষা।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles