বিশ্বে তেলের অভাব : বাংলাদেশে তেলের তেলিসমাতি?

বিখ্যাত লেখক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছিলেন তেল বা তৈল দুই প্রকার। এক তৈলে চাকা ঘুরে এবং আরেক তৈলে মন ফেরে।

অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন

আমাদের চাকা ঘুরার তৈলের জন্য দীর্ঘ লাইন আমরা হরহামেশা দেখছি। ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অল্প টাকার তৈল কিনে কোনো গ্রাহকই সন্তোস্ট নন। তারা আরো অধিক তৈল কিনতে চান । কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা ছাড়া বাকিদের ভাগ্যে শুধু হাহাকার এবং অন্তরজ্বালা। তেলের পাম্প ওয়ালাকে অতিরিক্ত টাকা বা ঘুষ দিয়ে তেল কিনতে হয়। তেলের এই মহামারির জন‍্য হাজার হাজার ট্রাক চালক বেকার হয়ে পড়েছেন। শত শত পাঠাও, বন্ধু এবং উভার চালকদের গৃহে হাহাকার । খাদ্যের অভাব। টাকা পয়সার অভাবে বাজার খরচ বন্ধ। তবে সরকার নির্বিকার। তাদের দাবি তেলের অভাব নেই। অনেক অনেক মওজুদ আছে। তাছাড়া টিভির পর্দায় সারাক্ষণ খবর ভাসছে — তেলের বড় বড় জাহাজ আসছে। সরকারের প্রোপাগান্ডা হচ্ছে দেশে তেলের কোনো অভাব নাই। তবে প্রতি সিলিন্ডার গ‍্যাসের দাম ১২০০ টাকা থেকে প্রায় ১৮০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে অর্থাৎ প্রায় ৩৩% শতাংশ বেড়েছে। এত দাম দিয়েও গ‍্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে তাই কালো বাজারীরা তৎপর— অতিরিক্ত দাম দিয়ে গ‍্যাস কিনতে হচ্ছে। গ‍্যসের কথা বাদ দিলাম। তেলের কথায় ফিরে যাই ।

তারিক রহমান সরকার বার বার দাবি করছেন যে দেশে তেলের কোনো অভাব নাই। বড় বড় নেতারা প্রায়ই বলছেন এবং স্বগর্বে বাণী ছড়াচ্ছেন যে তেলের কোনো অভাব নাই। অভাব নাই, অভাব নাই। প্রশ্ন হচ্ছে তারা আসলে কি যে তেলে মন ফেরে, বা যে তেলে কর্তা ব‍্যাক্তিরা খুশী হন, চাকরিতে পদোন্নতি হয়, ঘরে কাডা কাডা টাকার বান্ডিল আসে, সেই তেলের কথা বলছেন? সেটা যদি বলে থাকেন তাহলে ঠিকই বলছেন। বস্তুত মন ফেরার তেল বা তৈলের কোনো অভাব নাই।

বাংলাদেশে মন ফেরার তৈল সব সময়ই ছিল এবং এখন অনেক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আশীতিপর বৃদ্ধ নেতারা যাদের একপা কবরে এবং আরেক পা এখনো মর্তে, তারাও কিন্তু তৈল মরর্ধনে পিছপা নন। তেলের মহাসাগরে তাদের বসবাস, তারা তেলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তাই তারা যখন তখন ইতিহাস বিকৃত করেন। সর্ব স্বীকৃত তথ্য ও ইতিহাস বিকৃত করেন। কারণ তারা তেলের সাগরে ভাসছেন। তারা জ্ঞানে ও সজ্ঞানে মিথ্যাচার করে চলেছেন। তারা জ্ঞানপাপী।

আমাদের জাতির জন্য দুর্ভাগ্য যে শান্তিতে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুন যিনি মিথ্যাচার ও মব সন্ত্রাসীর জনক হিসাবে বহুল আলোচিত ও পরিচিত তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ সকল নেতারা অহরহ মিথ্যা বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের লজ্জা শরম আছে বলে মনে হয় না।

তারা বলে বেড়ান তাদের নেতা তারিক জিয়া নাকি শিশু মুক্তিযোদ্ধা— সাত বছর বয়সে তিনি দুইজন পাকিস্তানী সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। সুতরাং তিনিই যথার্থ শিশু মুক্তিযোদ্ধা। তারা আরো বলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বেগম খালেদা জিয়া নাকি পাকিস্তানি কেম্পে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে বসবাস করতেন এবং সেই সুবাদে তিনি নাকি তখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গোয়েন্দা হিসাবে কাজ করেছেন এবং সেজন্যই তিনি তাঁর স্বামী মুক্তিযুদ্ধের সেক্কর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের বার বার অনুরোধেও মুজিব নগরে যাননি। শোনেছি জেনারেল জিয়া তাকে সীমান্ত পাড়ি দিতে লোক পাঠিয়েছেন কয়েকবার। কিন্তু তিনি যান নি। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে থেকে ওদের সাথে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। বিশ্বাস হয়? সুতরাং তিনি নাকি প্রথম মহিলা মুক্তিযোদ্ধা যদিও বেগম জিয়া এমন সব দাবি কখনো করেননি। একেই কি বলে তৈল? উত্তম তৈল মর্ধন?

তারিক জিয়া এসব অতি উৎসাহী তৈল মর্ধকদের কিছু উত্তম মধ্যম দিলে পর এসব অবস্থা স্বাভাবিক হবে হয়তো। নতুবা ইতিহাস বিকৃতি যেমন চলবে, সরকারের গ্রহণযোগ্যতাও কমবে বৈকি।

কেউ কেউ আবার বলছেন একমাসেই তারিক জিয়া তার প্রস্তাবিত ৩১ দফা পূরণ করে ফেলেছেন যারফলে দেশে এখন কোনো অভাব নেই। সবার ঘরে ঘরে সুখ শান্তি এবং অফুরন্ত সম্পদ এবং আনন্দ বিরাজমান। দেশে চাকরির অভাব নেই, খাবার দাবারের অভাব নাই, জিনিসপত্রের দাম হুহু করে কমছে, বিদেশে চাকরির সুযোগ এখন অনেক অনেক বেড়েছে, স্বদেশে বিনিয়োগ হুহু করে বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে, দেশে বেকারত্ব নাই, কর্মসংস্থান হুহু করে বাড়ছে, দেশে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। এদের বয়ান কুখ্যাত ডাস্টবিন শফিক যিনি ড. মোহাম্মদ ইউনূসের প্রোপাগান্ডা বা প্রেস সচিব ছিলেন তাকেও হার মানাচ্ছে। তেলবাজদের কথা সত্যি হলে খুশী হতাম। তবে দূঃখজনক যে দেশের বাস্তব অবস্থা ভয়াবহ । সর্বত্র হাহাকার। পয়সা নাই, খাবার নাই, চাকরি নাই, ঔষধ নাই,— নাই, নাই সর্বত্র হাহাকার । ভবিষ্যতও অনিশ্চিত ।

এখনে উল্লেখ্য যে তাদের বয়ানে “যত দোষ মন্দ ঘোষ” এবং তা হচ্ছে সব দোষ শেখ হাসিনা সরকারের। হামের প্রাদুর্ভাবে ও টিকার অভাবে এক শতের বেশি শিশু মারা গেছে যাদের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস। দোষ হচ্ছে শেষ হাসিনার। তিনি ২০ মাস আগে ক্ষমতাচ্যুত হন। তবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে, অর্থাৎ শিশুদের জন্মের আগে তাদের তিনি ঠিকা দিয়ে যাননি। তিনি কতবড় সর্বনাশ করেছেন? শিশুদের তখনো জন্ম হয়নি, তাতে কি? তাদের মাকে ঠিকা দিয়ে গেলে তাদের নবজাতক সন্তানেরা ঠিকার অভাবে হাম হতো না, মারা যেত না। যুক্তি কিন্তু অকাট‍্য। তাই না? সাবাস তেলবাজরা।

তারিক রহমানের স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেছেন যে শেখ হাসিনা শিশুর জন্মের আগেই কেন ঠিকা দেননি, তার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি আরো বলেছেন শেখ হাসিনা ঠিকা কেনার জন্য কোনো টাকা রেখে যাননি। তাই তার কোনো পয়সা নাই। আর ভারত বিদ্ধেশীরা বলছেন যে শেখ হাসিনা তা ভারতে নিয়ে গেছেন?

তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। শেখ হাসিনা ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এসব ঠিকা ও স্বাস্থ্যখাতের জন্য রেখে যান। বাটপার ইউনূস সরকার সেই টাকা খেয়ে ফেলেছেন। তিনি তা কোথায় পাচার করেছেন তা আমরা জানি না। তারিক জিয়া সরকারকে এজন্য ইউনূস এবং তার সরকারকে জবাবদিহি করা উচিত।

কেউ কেউ দাবি তুলেছেন ঠিকার অভাবে যে শত শত শিশু মারা গেল, কত মায়ের বুক খালি হলো এবং ইউনূস সরকারে যারা এসব গাফলতির জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত। তবে সরকার এখনো নির্বিকার। বাংলাদেশে শিশু মরলে কি জবাবদিহিতার দরকার আছে? প্রতিদিনই তো বহু শিশু মারা যাচ্ছে, শত শত মানুষ বিনা বিচারে মারা যাচ্ছে, জেলের ভিতরে বন্দি অবস্থায় মারা যাচ্ছে, রাস্তাঘাট নদীনালা এবং জলাশয়ে কত শত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের লাশ পাওয়া গেল — কোনো লাশেরই তো সুস্ট তদন্ত বা বিচার হয়নি। তবে সময় সময় তদন্ত কমিটি হয়েছে — তাই যথেষ্ট। সুতরাং চুপ থাকুন। দেখেন না দেশের সংবাদ মাধ্যম এবং সিভিল সোসাইটির সুশীল সমাজ এসব মৃত্যু বা অবৈধ জেলজুলুম বা অমানবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আজ প্রায় ২০ মাস হলো কোনো কথা বলে না। তানাহলে তারা আতেলেকচুয়েল বা সুশীল সমাজ হয় কিভাবে? তারা কি মতলববাজ?

তবে হে ব‍্যাতিক্রম আছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বা সোসাল মিডিয়াতে দেখলাম যে এখনো শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া চালের বস্তা তারিক জিয়া সরকার বিলি করছেন। শেখ হাসিনা যে পারিবারিক কার্ড চালু করেছিলেন জনাব তারিক জিয়া সাহেব তা আবার ঘটা করে বিলি করছেন এবং তার তেলবাজরা দাবি করছেন এটা তারিক সরকারের বিরাট উদ্ভাবন। এদের কি বলে? তৈলবীজ?

দেশে এখনো তৈল শিক্ষার জন্য কোনো তৈল বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়নি। তবে তাতে আক্ষেপের কোনো কারণ নেই। বাঙ্গালীরা স্বাভাবসিদ্ধভাবে তৈল বিদ্যায় পরিপক্ক। তবে তৈল কলেজ হলে তৈলের প্রয়োগ হয়তো আরো মার্জিত হতো।

নোবেল বিজয়ী ইউনূস সরকার এবং তার একান্ত ঘনিষ্ঠজন যেমন আইন বিয়ষক উপদেষ্টা জনাব আসিফ নজরুল বার বার দাবি করেছেন যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে প্রতিবেশী ভারত সরকারের কাছে বিক্রি করে গেছে। ২৬ লক্ষ ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে চাকরি দিয়েছে যারফলে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা বেকার জীবন যাপন করছে। তিনি অবশ্য ১৮ মাসে এসব অবৈধ ভারতীয় নাগরিকদের খোঁজে পাননি। শেখ হাসিনা ভারত-বাংলাদেশ গ‍্যাসলাইন তৈরি করে ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে — এসব কত শত অভিযোগ তারা করেছেন। কিন্তু মজার ব‍্যাপার এই যে এখন এই দুঃসময়ের দিনে যখন গ‍্যাসের জন‍্য সর্বত্র হাহাকার তখন শেখ হাসিনার ঐগ‍্যাসলাইন দিয়ে ভারত থেকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। আহা, শেখ হাসিনা কত বড় অন্যায় করেছিলেন যে তিনি ভারত-বাংলাদেশ গ‍্যাসলাইন তৈরি করে গেছেন?

মোদ্দাকথা, আমাদের এই তৈলবাজরা হরহামেশা বয়ান দিচ্ছেন যে শেখ হাসিনা কোনো উন্নয়ন করে যান নাই। ১৫ বছরে প্রায় দুই হাজার লক্ষ কোটি টাকা ব‍্যাংক ঝণ নিয়েছেন। কতই না সর্বনাশ করেছেন। ঐসব ঝণ নিয়ে তিনি পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, আনবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকায় দৃস্টিনন্দিন ৩০ ফিট রাস্তা, অনেকগুলো অন্তনগর ছয় লেন মহাসড়ক, হাজার হাজার স্কুল, সমুদ্র বন্দর, ডিজিটাল ল‍্যব, শতশত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক, শত শত নদী খনন প্রকল্পসমূহ সম্পন্ন করেছেন এবং বহুবিধ অনুদান, বয়স্ক ভাতা, বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং দশ লাখের অধিক বাড়ি নির্মাণ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করে গেছেন । তবে নোবেল রোরেট বাটপার ইউনূস ১৮ মাসে ২৩ হাজার লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে কি করেছেন আমরা জানি না। তবে আমারা জানি যে উন্নয়নের জন্য একটি টাকাও খরচ করেননি। বর্তমান তারিক রহমান সরকার দেড় মাসে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঝণ নিয়েছেন বলে প্রকাশ। তিনি তা দিয়ে কি করছেন জাতি জানতে চায়।

তবে অতি উৎসাহী কোনো কোনো বিএনপি নেতা বা তৈলবাজ দাবি করছেন যে শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল বা তৃত্বীয় টার্মিনাল তৈরি করেন নি, বিএনপি সরকার তা করেছেন। বস্তুত: তারিক জিয়া একটা ফু দিয়েছেন, সিসিম খুল— আর সাথে সাথেই পদ্মা সেতু তৈরি হয়েছে, মেট্রোরেল চালু হয়েছে। উনার হাতে সোলেমান নবীর দৈত‍্য রয়েছে যারা উনার আদেশে এইসব বড় বড় প্রকল্প রাতারাতি তৈরি করে ফেলেছে!

সাবা বিশ্ব এখন জ্বালানির জন্য হিমশিম খাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর অভাবে জিনিসপত্রের মূল্য হুহু করে বাড়ছে, জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

তবে কি মজা, কি মজা!
বাংলাদেশে তেলের অভাব নাই। তেলবাজদেরও অভাব নাই। তবে মসকিল হচ্ছে যে যেতেলে মন ফেরে সে তেলে চাকা ঘুরে না, কলকারখানা চলে না। সুতরাং বেজায় মসকিল। এগুলো থেকে উদ্ধার হতে হলে তেলবাজী বাদ দিন। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা মোকদ্দমা দিয়ে বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইউনূসের শিখানো এসব অপকর্ম বন্ধ না করলে দেশের ও জনগণের মঙ্গল এবং উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের স্থায়ীত্ব নিয়ে তখন ঠানাঠানি শুরু হবে, দেশে কোনো বিনিয়োগ আসবে না, কর্মসংস্থান হবে না। তাছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে শেখ হাসিনার ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সোনার বাংলা অর্থাৎ একটা উন্নত সমৃদ্ধশালী ঠিকসই ডিজিটাল অর্থনীতি অর্জন করা সম্ভব হবে না।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles