আওয়ামী লীগ কারও অনুগ্রহে ফিরবে না: মাসুদ কামাল

তৃণমূলের শক্তিতেই পুনরুত্থানের সম্ভাবনা; অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের দাবি—দায়মুক্তি ও রাজনৈতিক ‘চাটুকারিতা’ নিয়েও কড়া সমালোচনা

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্তর্বর্তী সরকার বা বিএনপির অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। দলটি যদি রাজনীতিতে ফেরে, তবে তা তৃণমূলের কর্মীদের জোরেই ফিরবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাসুদ কামাল।

সম্প্রতি ‘মানচিত্র’ টিভির নিয়মিত আয়োজন ‘কথোপকথন’–এ যোগ দিয়ে দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, প্রশাসন, দায়মুক্তি এবং ভূরাজনীতি নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মঞ্জুরুল আলম পান্না।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মাসুদ কামাল বলেন, আওয়ামী লীগ এ দেশে এসে কী করবে, তা বিএনপি সরকারের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপর। দলটির শীর্ষস্থানীয় যেসব নেতা দলকে পথে বসিয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে।

মাসুদ কামাল বলেন, ‘বিশাল বিশাল সব ফিগার, হিমালয় পর্বতের মতো অবস্থা—সেই নেতাদের কাজ শেষ। তাঁরা এমনিতেও দেশে ফিরতে পারতেন না, এ দেশের মানুষ তাঁদের নিত না। ওই নেতারা হয়তো বিএনপির কাছে অনুগ্রহ চান, কিন্তু দেশের অগণিত আওয়ামী লীগ কর্মী কারও কাছে অনুগ্রহ চান না। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নেবেন। আওয়ামী লীগ ফিরলে নিজ জোরেই ফিরবে, কারও কাছে তাদের কৃতজ্ঞ থাকার প্রয়োজন হবে না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, আইনের শাসন কায়েম হয়েছে কি না, তা প্রমাণের জন্য হলেও এসব অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বর্তমান প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এ বি এম সাত্তারের একটি পুরোনো বক্তব্যের সূত্র ধরে মাসুদ কামাল বলেন, ‘সাত্তার সাহেব প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে আটজন উপদেষ্টার দুর্নীতির গোয়েন্দা প্রতিবেদন তাঁর কাছে আছে। সরকারের কাছে তো এসব তথ্য আছে। তাহলে তা ধরে টান দিলেই হয়। এটি যদি তদন্ত না করা হয়, তবে বুঝতে হবে দুর্নীতিগুলোকে সমর্থন করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, হয় ওই আট উপদেষ্টার দুর্নীতির বিচার হতে হবে, নয়তো এমন বক্তব্য দেওয়ার জন্য সাত্তার সাহেবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্প্রতি ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে’ অংশগ্রহণকারীদের আইনি দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, ‘ড. আসিফ নজরুল যদি বলেন আমি জুলাই যোদ্ধা, তাহলে তিনিও কি দায়মুক্তি পাবেন? কোনো কিছুরই দায়মুক্তি হয় না। ইতিহাস বলে, দায়মুক্তি কখনো টেকে না। পরবর্তী সরকার এসে এসব দায়মুক্তি বাতিল করে দেয়।’

প্রশাসন ও গণমাধ্যমে চলমান চাটুকারিতার তীব্র সমালোচনা করেন মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে যেসব আমলা বা সাংবাদিক সুবিধাভোগী ছিলেন, পদোন্নতি পেয়েছেন, তাঁরাই এখন খোলস পাল্টে কট্টর বিএনপি বনে গেছেন।

এটিকে ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ ও ‘বাঘ-বিড়ালের খেলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার পালাবদলে বাঘ বিড়াল হয়, আর বিড়াল বাঘ হয়—এটাই বাস্তবতা। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বা ওপরে ওঠার জন্য তারা প্রতিনিয়ত চাটুকারিতা করে যাচ্ছে। এসব সুবিধাবাদীর প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো শ্রদ্ধা নেই।’

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ভারত সফরের ঠিক আগমুহূর্তে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের উদ্যোগকে ভারতের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের একটি ‘টেস্ট কেস’ হতে পারে বলে ধারণা মাসুদ কামালের।

ভারতের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের ক্ষমতায় এমন একটি সরকার চায়, যারা তাদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে না বা তাদের সেভেন সিস্টার্সের বিদ্রোহীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। ভারত আওয়ামী লীগের জন্য বসে বসে কাঁদছে না বা দলটির নেতাদের খাইয়ে-পরিয়ে রাখছে না।

মাসুদ কামাল বলেন, ‘দেশ থেকে লুটপাট করে নেওয়া টাকা দিয়েই আওয়ামী লীগের নেতারা সেখানে আছেন, ভারতের এতে কোনো ক্ষতি নেই।’ এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ভারত একজন মুসলিম ও অপেশাদার কূটনীতিককে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক শুভেচ্ছাবার্তা হিসেবে দেখছেন এই বিশ্লেষক।

পরিশেষে দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিবেশীর সঙ্গে সারাক্ষণ ঝগড়া না করে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

শিরোনাম ও উপশিরোনাম

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles