শরীয়তপুরে হামলার শিকার কিশোরদের প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে কারাগারে

আওয়ামী লীগ হিসেবে টার্গেট করে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও শিশু আইনের লঙ্ঘন নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন

শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুই কিশোরকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হওয়ার পর উল্টো তাদেরই শিশু সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ মার্চ ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বাড়িতে ফেরেন স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা মো. শাওন হাওলাদার। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ধনকাঠি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পৌঁছালে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল তার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাকে আক্রমণ করে। শাওনকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তার মা-ও হামলার শিকার হন। এতে তার হাত-পা ভেঙে যায় এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। শাওন নিজেও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হন।

পরিবারের অভিযোগ, হামলার পেছনে স্থানীয় বিএনপি-সমর্থিত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হামলার পরপরই নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারটি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। পরে তাদের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পুরো বাড়িটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ হিসেবেই এই অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয় দুই কিশোরের গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনা। পরিবারের দাবি, ১৫ বছর বয়সী ওমর—যিনি শাওনের ছোট ভাই—এবং তার ১৬ বছর বয়সী আত্মীয় নিরবকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক করা হয়। পরে তাদের প্রকৃত বয়স গোপন রেখে আদালতে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় দেশের শিশু আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচার করা বা কারাগারে পাঠানো সম্পূর্ণ বেআইনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেও শিশুদের জন্য আলাদা বিচারব্যবস্থা ও সুরক্ষার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

প্রখ্যাত আইনজীবী মঞ্জিল মোরশেদ এ বিষয়ে বলেন, “শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো শুধু আইনি ভুল নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আটক শিশুদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।”

শুধু তাই নয়, ভুক্তভোগীদের আইনজীবীদেরও আদালত প্রাঙ্গণে বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গত ৩১ মার্চ মামলাটি আদালতে ওঠার সময় এই ঘটনা ঘটে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিবারের আরও অভিযোগ, তারা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। বরং উল্টো শাওন হাওলাদারের পরিবারের ১২ জন সদস্যকে আসামি করে একটি মামলা (জিআর নং ৪৬/২০২৬) দায়ের করা হয়েছে। এমনকি আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও এমদাদ নামের এক ব্যক্তিকে জেলগেট থেকে আবারও অন্য একটি অজ্ঞাত মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে শাওন হাওলাদার ও তার পরিবার ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ফোনে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরতে পারছি না। আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আমার মাকে কুপিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। এখন আমার ছোট ভাইদের মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়েছে। আমরা শুধু বাঁচতে চাই, এই অন্যায়ের বিচার চাই।”

ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এলাকাজুড়ে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে, যা আইনের শাসনের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শরীয়তপুরের এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৃহত্তর একটি প্রবণতার অংশ। রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles