ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ লাভলু মোল্লাকে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সোমবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী তাকে চতুর্থ শ্রেণির স্টাফ কোয়ার্টার থেকে ধরে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। পরদিন মঙ্গলবার আদালত তার জামিন আবেদন খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনাটি শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তার গ্রেপ্তার নয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত কয়েক মাসে তৈরি হওয়া দমন–পীড়নের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক বৈরিতার গভীরতা নতুন করে সামনে এনেছে।
ফেসবুক পোস্ট থেকে উত্তেজনা
ঘটনার সূত্রপাত একটি গ্রাফিক থেকে, যেখানে শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে লেখা ছিল—“I don’t care.”
এই পোস্ট সন্ধ্যার পর থেকেই ক্যাম্পাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সমর্থক ও ইসলামি চেতনার ছাত্রগোষ্ঠীগুলো পোস্টটিকে ‘রায়কে অসম্মান’ হিসেবে দাবি করে রাতেই লাভলুর বাসার সামনে জড়ো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমও সেখানে হাজির হয়, যার সঙ্গে যুক্ত হয় ইসলামী ছাত্র শিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু চরমপন্থী শিক্ষার্থী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা জোরে জোরে স্লোগান দিচ্ছিল—লাভলুকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে গণপিটুনি দেওয়ার হুমকি উচ্চারণ করছিল।
মুহূর্তটি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
“আমি কোনো অন্যায় করিনি”
ঘেরাও ও স্লোগানের মধ্যে লাভলু নিজ বাসা থেকে ফেসবুকে লাইভে এসে জানান—
“আমি কোনো অন্যায় করিনি। তবুও আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শত অত্যাচার হলেও আমার সততা বা নৈতিক অবস্থান বদলাবে না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসবেন।”
এই লাইভটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেক শিক্ষক–শিক্ষার্থী বিস্মিত হন যে একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা রাতবিরেতে ‘মব অ্যাকশনের’ মুখে পড়তে পারেন।
শাহবাগ থানা–পুলিশ কিছুক্ষণ পর তাকে আটক করে।
পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো
সোমবার গভীর রাতে থানায় নেওয়ার পর পুরো রাত তাকে হেফাজতে রাখা হয়। আটকের প্রায় আট ঘণ্টা পর শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দ্য ভয়েস-কে বলেন—
“সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আগের একটি মামলায় লাভলুর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।”
আইনজীবী মহলের মতে, এটি নতুন প্রশাসনের বহুল ব্যবহৃত প্যাটার্ন—প্রথমে আটক, পরে মামলার ব্যাখ্যা তৈরি।
ডাকসুর নেত্রীর হুমকি
ঘটনার পর ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন–বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ফেসবুকে লিখেছেন—
“লাভলুরে পুলিশের হাতে সোপর্দ কইরা এলাম। গণহত্যাকারী টিচারদের ব্যাপারেও আমাদের সেইম স্ট্যান্ডই থাকবে। উনাদের নিয়ে কেউ সুশীলতা করলে তাদেরও হিসাব নেওয়া হবে।”
তার এই পোস্ট শিক্ষকসমাজে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কণ্ঠে এমন সহিংস, হুমকিমূলক ভাষা কীভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠল? এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এসব বক্তব্যকে কীভাবে দেখছে?
আদালতে জামিন নামঞ্জুর
মঙ্গলবার ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক মাসুম মিয়া তার জামিন আবেদন খারিজ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশের ভাষ্য ও পুলিশের উপস্থাপনার ধরন থেকে স্পষ্ট, প্রশাসনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।
কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষক সমাজের মতে, ফেসবুক পোস্টের জন্য এ ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী মামলা আইনের গুরুতর অপপ্রয়োগ।
লাভলু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন এবং পরে কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্য নতুন কিছু নয়।
অনেকের মতে, তাকে টার্গেট করা হয়েছে শুধু একটি পোস্টের কারণে নয়—বরং তার রাজনৈতিক পরিচয় ও নীতিগত অবস্থান বর্তমান প্রশাসনের অপছন্দ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয় ও দমন–পীড়নের নতুন বাস্তবতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, প্রগতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার কেন্দ্রস্থল। কিন্তু গত কয়েক মাসে চিত্রটি পাল্টে গেছে।
- প্রশাসনের একাংশ রাজনৈতিক চাপে কাজ করছে,
- উগ্রপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীগুলো ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করছে,
- ভিন্নমত দমনে ‘অফিসিয়াল’ ও ‘অনানুষ্ঠানিক’ দুই ধরনের শক্তিই ব্যবহৃত হচ্ছে,
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকেও ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
লাভলু মোল্লার ঘটনা এই নতুন বাস্তবতার একটি ভয়াবহ নজির—যেখানে একটি গ্রাফিক শেয়ার করার কারণে একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা মব-ঘেরাও, হুমকি, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মুখে পড়তে পারেন।
অনেকে এটিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন—যে চেতনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের সর্বত্র।

