যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলেছে, সরকার বদলে জড়িত ছিল আগের মার্কিন সরকার: জয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে ট্রাম্প প্রশাসন—ইসলামি উগ্রবাদ নিয়ে বাড়ছে মার্কিন উদ্বেগ। অবৈধ বিচারে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সজীব ওয়াজেদ জয়

যুক্তরাষ্ট্রের আগের সরকার বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোটি কোটি ডলার ঢেলেছিল”—এমন অভিযোগ তুলেছেন তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তবে তার দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন “পুরোপুরি বদলে গেছে” এবং মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ ও ইসলামি উগ্রবাদের উত্থান নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয় বলেন, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বলেছেন আগের প্রশাসন ইউএসএইডের মাধ্যমে বাংলাদেশের রেজিম চেঞ্জে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করেছে,”—উল্লেখ করেন তিনি।

‘আমাদের ওপর কোনো হুমকি আসেনি’

সংবাদদাতার প্রশ্নে জয় বলেন, শেখ হাসিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কখনই সরাসরি কোনো হুমকি পায়নি। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ ছিল যারা নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। “বাকি বিশ্ব নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ বলেছিল। তা সরাসরি চাপ বা হুমকি—এমন কিছু ছিল না।”

তার মতে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুনভাবে দেখছে। “এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ইসলামি উগ্রবাদ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাসবাদ নিয়েই বেশি চিন্তিত,”—বললেন তিনি।

ঢাকার সংকটে ভারতের ভূমিকা: ‘মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে’

জয় বিশেষভাবে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, গত বছরের সহিংসতার সময় শেখ হাসিনার জীবন বাঁচাতে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, “ভারত সবসময় আমাদের ভালো বন্ধু। সংকটের সময় ভারত আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে। তিনি যদি বাংলাদেশে থেকে যেতেন, উগ্রবাদীরা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।”

৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনটি শুরুতে ‘ছাত্র’ আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা গণভাবে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন আক্রমণ করলে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং ভারতে আশ্রয় নেন।

বিচার প্রক্রিয়া ‘অবৈধ, রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত’

ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে ভারতে থেকে ফেরত পাঠানোর জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও জয় বলেন—বাংলাদেশের বর্তমান “অবৈধ ও অসাংবিধানিক” সরকারের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তো দূরের কথা—সংবিধান ও আইনের মৌলিক শর্তও পূরণ করেনি।

“মাকে দোষী সাব্যস্ত করতে সরকার মধ্যরাতে আইন সংশোধন করেছে। এসব সংশোধনই ছিল বেআইনি। মায়ের আইনজীবীরা আদালতে ঢুকতেই পারেননি। ১৭ জন বিচারককে বরখাস্ত করে নতুন রাজনৈতিক বিচারক বসানো হয়েছে,”—অভিযোগ করেন তিনি।

তার মতে, যেখানে কোনো বিচারই বৈধভাবে হয়নি, সেখান থেকে করা কোনো প্রত্যার্পণ অনুরোধেরই আইনি মূল্য নেই।

আইসিটির রায় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা

১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও দুই সাবেক কর্মকর্তাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায় ঘোষণার সময় শেখ হাসিনা ছিলেন অনুপস্থিত, এবং রায় পড়ে শোনানোর দৃশ্য দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, আইন বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা রায়কে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” ও “দ্রুতগতি আদালত” বলে উল্লেখ করছেন। অনেকের মতে, বিচারটি যেন ইউটিউব লাইভ করার মতো নাট্যধর্মী একটি আয়োজন ছিল—যার লক্ষ্য ছিল মামলা নয়, রাজনৈতিক বার্তা।

ইসলামি উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

জয় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের ইসলামি উগ্রবাদ নিয়ে চিন্তিত। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় যে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোসহ নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিগুলো জাতীয় রাজনীতি ধরাশায়ী করেছিল—নতুন মার্কিন প্রশাসন সেই বাস্তবকেই বড় করে দেখছে।

অওয়ামী লীগের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন—বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাবে পরিচালিত এবং যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করছে।

ভারতের জন্যও একটি কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণ

বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে চাওয়া ভারত—অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর চাপের মুখে। তবে এখনো পর্যন্ত নয়াদিল্লি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি।

অ্যানআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয় বলেন, “প্রত্যার্পণ হতে হলে সঠিক বিচার প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। বর্তমান বাংলাদেশে কোনো আইনানুগ প্রক্রিয়া নেই।”

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles