যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ বাড়ছে, অবৈধ অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ

যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে—এমন কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। দ্য টাইমস–এ দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়লেও রাজনীতির একাংশ, বিশেষ করে চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো, তা স্বীকার করতে অনীহা দেখাচ্ছে। আর সেই অস্বীকারই ব্রিটেনে জাতিগত উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শুধু তিনি নন—তার পুরো পরিবারই সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণবাদী ও ইসলামবিরোধী গালাগালির শিকার হচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের অপমান আমার কাছে নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বেড়েছে, জীবনের অন্য কোনো সময়ে এমনটা দেখিনি।”

পরিবারের সবাই আক্রান্ত: ‘ফিরে যাও নিজের দেশে’—গালাগালি এখন নিত্যদিনের ঘটনা

মাহমুদ বলেন, তার বাবা–মা, ভাই–বোন, কাজিনসহ পরিবারের একাধিক সদস্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে বর্ণবাদী হামলার মুখে পড়েছেন। রাস্তায়, কর্মস্থলে বা গণপরিবহনে “গো ব্যাক হোম” বা “ফিরে যাও নিজের দেশে” ধরনের গালাগাল এখন আবার সাধারণ ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।

“দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে জাতিগত সম্প্রীতির অবনতি স্পষ্টই বোঝা যায়,”—বললেন তিনি।

‘অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগকে অস্বীকার করা মানে জনগণকে গ্যাসলাইট করা’

ব্রিটেনের বার্মিংহামে জন্ম নেওয়া, কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক বলেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকেই গড়ে উঠেছে। তার মতে, সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকরা অভিবাসননীতির বাস্তব চিত্র নিজ চোখে দেখছেন। ফলে তাদের উদ্বেগকে খাটো করে দেখা বা “গ্যাসলাইট” করা দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়।

“মানুষ দেখছে যে সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে না। তাদের উদ্বেগ অস্বীকার করা ভুল। আমরা যদি তাদের কথা না শুনি, তাহলে চরম ডানপন্থী শক্তিগুলোই সুবিধা পাবে,”—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সতর্কবার্তা।

তিনি ইঙ্গিত দেন, যদি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হয়, তাহলে নাইজেল ফারাজের মতো উগ্র-ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিবিদদের উত্থান আরও ত্বরান্বিত হবে।

নতুন অভিবাসন নীতি: ‘আর্জিত বসবাস’ মডেলে বড় পরিবর্তন

সম্প্রতি শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্টে যে অভিবাসন সংস্কার বিল উপস্থাপন করেছেন, সেটিকে হোম অফিস “গত দুই দশকের সবচেয়ে বড় সংস্কার” হিসেবে বর্ণনা করছে।

নতুন নীতির কিছু প্রধান দিক হলো—

  • যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবশ্যিক সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা,
  • উচ্চ করদাতাদের জন্য দ্রুত নাগরিকত্ব/সেটলমেন্টের সুযোগ,
  • শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী নীতিতে কঠোরতা ও জাল দাবি প্রতিরোধে নতুন ব্যবস্থা।

মাহমুদের মতে, “অবাস্তব প্রতিশ্রুতি” এবং ব্যর্থ প্রশাসনিক কাঠামোই ব্রিটিশদের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে হতাশা বাড়িয়েছে। তাই স্বচ্ছ ও দৃঢ় নীতি ছাড়া জনআস্থা ফিরবে না।

জাতিগত সম্প্রীতির সংকট—কোথায় যাচ্ছে ব্রিটেন?

বিশ্লেষকদের মতে, মাহমুদের বক্তব্য যুক্তরাজ্যের সামাজিক টানাপোড়েনের একটি জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে:
একদিকে বর্ণবাদ ও বৈরিতা বাড়ছে, অন্যদিকে ভাঙা অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ উথাল–পাথাল।

দেশটির প্রথম মুসলিম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই খোলামেলা বক্তব্য ব্রিটেনে রাজনৈতিক সততার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে বলে অনেকেই মনে করেন।

প্রশ্ন শুধু অভিবাসন আইন নয়—দীর্ঘমেয়াদে ব্রিটিশ সমাজ কতটা বিভক্ত বা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, সেটিও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

spot_img