জুলাই ২০২৪–এর পর বাংলাদেশে বাড়ছে ধর্মীয় মৌলবাদ

জুলাই ২০২৪–এর পর উগ্র ইসলামপন্থীদের উত্থান নারী অধিকার, সাংস্কৃতিক চর্চা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে গভীর সংকটে ফেলছে—নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদন

জুলাই ২০২৪–এর গণবিক্ষোভের পর বাংলাদেশ দ্রুত এক গভীর মৌলবাদী অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে ভারতের আঞ্চলিক গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ-এ প্রকাশিত একটি বিশদ প্রতিবেদন।

প্রতিবেদনটি বলছে, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান শুধু দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দিচ্ছে না, বরং নারীর অধিকার, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তাকেই গুরুতর হুমকির মুখে ফেলেছে।

নারী ও সংস্কৃতির ওপর চরমপন্থীদের নতুন আক্রমণ

প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন উগ্রপন্থীরা প্রকাশ্যেই নারীর সামাজিক অগ্রযাত্রা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছে।

নারী ক্রীড়াবিদদের উত্যক্ত করা এখন সাধারণ ঘটনা। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট প্রায় জনপরিসরের অনুষ্ঠান বন্ধের পর্যায়ে। রবীন্দ্রসংগীত ও নৃত্যনাট্যের আয়োজনেও পুলিশ আপত্তি তুলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারীর হাতে “অপ্রকাশ্য পোশাক” পরার অভিযোগে এক নারীকে হয়রানির ঘটনার উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও কয়েকশো ধর্মান্ধ লোক থানা ঘেরাও করে তাকে ছিনিয়ে নেয় এবং পরে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে দাম্ভিক বক্তৃতা দিতে দেখা যায় তাকে।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, কারা এখন রাজপথে ক্ষমতার আসল নিয়ন্তা।

স্কুল থেকে বাদ পড়ে সঙ্গীত, জোর বাড়ছে ধর্মীয় শিক্ষায়

সাম্প্রতিক সময়ে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীতশিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব বাতিল করেছে—যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই পাঠ্যক্রমের অংশ ছিল।
উগ্র ইসলামপন্থীরা সঙ্গীতকে “অইসলামিক” দাবি করে বদলে ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানায়। সরকার সেই দাবির দিকেই ঝুঁকেছে বলে প্রতিবেদনের মন্তব্য।

ওহাবি মতাদর্শের বিস্তার ও মাদ্রাসার উত্থান

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে এখন ১৫–২০ হাজারের মতো মাদ্রাসা বা ধর্মীয় পাঠশালা রয়েছে যারা আরবি শিক্ষা ও কঠোর ওহাবি মতাদর্শ প্রচার করছে। এই বিপুল বিস্তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুত দক্ষিণ এশিয়ার নতুন মৌলবাদী ভূখণ্ডে পরিণত হচ্ছে।

মৌলবাদীদের হাতে ভেঙে পড়ছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও সুফি ঐতিহ্য

জুলাইয়ের বিদ্রোহের পরপরই ইসলামপন্থীরা দেশব্যাপী ভাস্কর্য ধ্বংসে নামে—বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের নেতা ও শহীদদের ভাস্কর্যগুলো টার্গেট করা হয়।

প্রতিবেদন দাবি করেছে, সুফি মাজারগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এখন ধ্বংসস্তূপ। সুফি গায়ক ও সাধকদের দাড়ি কামিয়ে ধর্মীয় রূপে “ঢেলে সাজানো” হয়েছে। নানা সাংস্কৃতিক চর্চা প্রকাশ্যেই আক্রান্ত।

ছাত্রআন্দোলন নয়, পরিকল্পিত উত্থান—জামায়াতের স্বীকারোক্তি

২০২৪ সালের আন্দোলনকে এতদিন ছাত্রদের আকস্মিক গণবিক্ষোভ হিসেবে বলা হলেও এখন তা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা দাবি করেছেন—“শুরু থেকে শেষ—সবটাই আমাদের আন্দোলন।”

শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, সেখানে ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র হিসেবে জায়গা করে নেয়। রাজনৈতিক শূন্যতা কাজে লাগিয়ে তারা এখন সরাসরি ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করছে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা

প্রতিবেদন মতে, বিপদ দুটি—
১) ধর্মনিরপেক্ষ জনপরিসর সংকুচিত হওয়া: নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হওয়া, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুটিয়ে যাওয়া, মাজার ধ্বংস।
২) রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং UN মিশনের ওপর নির্ভরশীল; চরমপন্থী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা।

প্রতিবেদনের ভাষায়—“বাংলাদেশ খুব শিগগিরই পাকিস্তানের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। কারণ পাকিস্তানে সেনাবাহিনী শক্তিশালী, আদালতও কিছুটা স্বাধীন। কিন্তু ঢাকায় পরিস্থিতি উল্টো।”

ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ

বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্তরা বলছেন—দেশটি ১৯৭১–এর জন্মপরিচয় থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে।
একজন প্রভাবশালী নেতা বলেছেন—“এটা ক্ষমতার লড়াই নয়; আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার লড়াই।”

নারী অধিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও সতর্ক করে বলছে, যদি এই প্রবণতা থামানো না যায়, তাহলে অধিকার হ্রাস ও সাংস্কৃতিক পশ্চাদপসরণ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাবে।
ঢাকার এক এনজিও নেত্রী বলেন— “যে সমাজ নারীর গান, নাচ, মঞ্চ বন্ধ করে দেয়—সে সমাজ ভবিষ্যতের দরজাও বন্ধ করে দেয়।”

বাংলাদেশ বহুদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও প্রগতিশীল নীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। আজ মৌলবাদের উত্থান ও গণতান্ত্রিক সংকোচনের ফলে সেই পরিচয়ই সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে। অনেকের মতে—এই স্রোত রুখে দেওয়া না গেলে দেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ভিন্ন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে।

spot_img