বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হয়েছে আওয়ামী লীগের এক কঠোর অভিযোগে। দলটি জানিয়েছে—মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার কারাগারের ভেতর একটি “পদ্ধতিগত হত্যামিশন” চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও প্রগতিশীল ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করা।
শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে, সরকারের নির্দেশে এবং কারা কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণে “একটির পর একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে”—এবং প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই নকশা, একই ধরনের হাতিয়ার।
দলের ভাষ্য—গত কয়েক মাসে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে কারাগারের ভেতর বা মুক্তির পরপরই সন্দেহজনকভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আছেন প্রাক্তন মন্ত্রিসভার সদস্য, কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা–উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মী।
‘স্লো পয়জন’—নতুন আতঙ্কের নাম
বিবৃতিতে বলা হয়, কারা কর্তৃপক্ষ যেন কোনো অদৃশ্য নির্দেশে “মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারীর ভূমিকা” পালন করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দিদের খাবারে বিষ মেশানো হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে শরীর নষ্ট করে দিচ্ছে। অনেকে মুক্তির পর চিকিৎসকদের কাছে গেলে দেহে বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের দাবি—“কারাগারের ভেতরে পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে, আর জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এভাবে মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।”
দলটি আরও জানায়, যারা জামিনে বেরিয়ে আসছেন, তারা তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়া অনুভব করছেন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসার মাধ্যমে এর উৎস সম্পর্কে প্রমাণও পাচ্ছেন। কয়েকজন প্রকাশ্যে এসব তথ্য জানিয়েও দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার অভিযোগ
বিবৃতিতে আরও বলা হয়—“যখন কোনো স্বীকৃত সাম্প্রদায়িক–রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়, তখন রাষ্ট্রই পরিণত হয় সন্ত্রাসের কারখানায়। আর সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর একের পর এক ‘ফাঁসুড়ে’ তৈরি হতে থাকে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—এই অভিযোগগুলো হঠাৎ করে আসেনি। আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নিখোঁজের অভিযোগ ছিল। কিন্তু “কারাগারের ভেতর হত্যার” অভিযোগ পরিস্থিতিকে নতুন এক ভয়ঙ্কর স্তরে নিয়ে গেছে।
কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গত কয়েক মাসে আটক ব্যক্তিদের ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেকেই চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন, অনেকের মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের অভিযোগ—এই মৃত্যুগুলো কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়; এগুলো রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার ছদ্মআবরণ মাত্র।
একজন প্রবীণ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—“কারাগার এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধের ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা বঞ্চনা, বিষক্রিয়া, মানসিক নির্যাতন—সব মিলিয়ে বন্দিদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ।”
আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ বলেছে, দেশের কারা ব্যবস্থার ওপর বর্তমান সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—বরং সরকারই এটি পরিচালনা করছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে। ফলে কেবল দেশীয় তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে না।
দলটি তাই জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। দলটি বলেছে—
“এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হলে আন্তর্জাতিক তদন্তই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।”
রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও উত্তপ্ত
এ অভিযোগ আসছে এক সংকটময় সময়ে—যখন দেশ নির্বাচন সামনে রেখে কঠোর রাজনৈতিক দমন–পীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা হয় কারাগারে, নয় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। এসব পরিস্থিতির ভেতর ইউনুস সরকার কারাগারকে রাজনৈতিক নিধনের অদৃশ্য ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে—এমনটাই মনে করছেন দলটির নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসব অভিযোগ যাচাই–বাছাই ছাড়া থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

