বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সাজানো কথিত বিচারে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর সবচেয়ে কড়া নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনা এসেছে ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে। চার্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে—এই রায় “একপেশে”, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং দেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ধ্বংসের ভয়াবহ সংকেত।
১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপরই বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলনের সেক্রেটারি এবং ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের প্রধান বিশপ পোদেন পল কুবি দৃঢ় ভাষায় এই রায়ের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায়—শুধু রাজনৈতিক দল নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে অবৈধ, অন্যায় ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দেখছে।
“সভ্যতার পথে নয়, বরং বর্বরতার যুগে ফিরে যাওয়া”—বিশপ কুবি
রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর বিশপ কুবি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ‘সভ্য সমাজের বিচার নয়’, বরং ‘রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনী।’ তিনি তিনটি বড় উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন—
• অভিযুক্তদের যথাযথ আইনজীবীর সুযোগ দেওয়া হয়নি,
• রায়টি একতরফাভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে,
• এবং ক্যাথলিক চার্চ নীতিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে।
তিনি বলেন, “ক্যাথলিক চার্চ কখনোই মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। কেউ অপরাধ করলেও তার শাস্তি হবে সংশোধনের সুযোগ রেখে—প্রতিশোধ নিয়ে নয়। ন্যায়বিচারের মূলে আছে ন্যায়, হিংসা নয়।”
চার্চের এই কণ্ঠস্বর আওয়ামী লীগের বহুদিনের অভিযোগকেই আরও শক্তিশালী করেছে—বিচারটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার, যেখানে সত্য, মানবাধিকার বা আইনি ন্যায্যতা কোনওটাই রক্ষা পায়নি।
প্রশ্নবিদ্ধ ট্রাইব্যুনাল, প্রশ্নবিদ্ধ বিচার
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দাবি করেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা নাকি ড্রোন, হেলিকপ্টার ও মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, যাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণগ্রেপ্তার, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনসহ অগণিত অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রশ্ন—একটি অগণতান্ত্রিক, অনির্বাচিত, সামরিক সমর্থিত সরকার গঠিত হওয়ার পর যে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়, তার রায় কতটা বৈধ? অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এমন একটি শাস্তি কি আদৌ গ্রহণযোগ্য?
আগস্ট-পরবর্তী অরাজকতা ও সহিংসতার দায় কে নেবে?
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পরপরই দেশজুড়ে যে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তার দায় আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে পুরোপুরি অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ইসলামপন্থি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয় অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত। তবে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের দাবি—এই হত্যাকাণ্ডের বড় অংশই ঘটেছে ৫ আগস্টের পর, যখন ইউনুসপন্থি গোষ্ঠী ক্ষমতা দখলে সহিংস অভিযান শুরু করে।
তারা ঘরেঘরে হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং তাদের পরিবারকে হত্যা করেছে; সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন ধরিয়েছে; দোকানপাট লুট করেছে; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিয়েছে। অথচ জাতিসংঘের রিপোর্টে এই হামলাগুলো শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—যা আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষায় ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা।’
দলটির দাবি—এই সহিংস গোষ্ঠীগুলো ৫০০-র বেশি থানা আক্রমণ করে দুই হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। কিন্তু ইউনুস প্রশাসন স্বীকার করেছে মাত্র ৪৪ পুলিশের মৃত্যুর কথা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঢল
আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকেও ছাড়িয়ে গেছে—
• প্রথম সপ্তাহেই শত শত বেসামরিক মানুষকে হত্যা,
• সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা,
• সাংবাদিক-শিক্ষক-লেখকদের ওপর নিপীড়ন,
• নির্বিচারে গ্রেপ্তার,
• এবং আওয়ামী লীগকে সংগঠনিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা।
ইউনুস প্রশাসন তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা নিষিদ্ধ করতে যে ‘দায়মুক্তি আদেশ’ দিয়েছে, সেটিই এখন দেশে আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ভাঙনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিভক্ত প্রতিক্রিয়া; নৈতিক প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু এবার চার্চ
ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর সরকারপন্থিরা উদযাপন র্যালি বের করলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা রায়কে “বিচারের নামে হত্যা” বলে নিন্দা জানায়। কিন্তু চার্চের কড়া ভাষার সমালোচনা দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত রাজনৈতিক রায় বা বিতর্কে সরাসরি অবস্থান নেয় না। ফলে তাদের এই প্রতিবাদে দেশের নাগরিক সমাজে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা কি আদৌ আছে?
নির্বাচন সামনে, প্রশ্ন আরও গভীর
অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্দেহজনক বৈধতার সরকারকে ভারতের হাতে একজন নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
আর সামনে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। চার্চের এই নৈতিক অবস্থান এবং বিতর্কিত রায়—দুটোই রাজনৈতিক আবহকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। দেশে-বিদেশে গণতান্ত্রিক পথচলায় ফিরে যাওয়ার দাবি আরও প্রবল হচ্ছে।
নৈতিকতার দাঁড়িপাল্লায় কে হারে, কে জেতে?
আওয়ামী লীগ এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের চোখে, চার্চের বিবৃতি একটি বড় সত্যকে সামনে এনেছে—বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চলছে।
একদিকে সভ্যতা, মানবাধিকার ও নৈতিকতার আহ্বান; অন্যদিকে অগণতান্ত্রিক সরকারের মৃত্যুদণ্ডের রাজনীতি—এই বৈপরীত্যই এখন পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকটকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
ক্যাথলিক চার্চ মানুষের মর্যাদা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের দিকে দাঁড়িয়েছে। আর এতে উন্মোচিত হয়েছে সেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের আসল চেহারা—যেখানে লক্ষ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে নিশ্চিহ্ন করা।

