অর্থনীতির সংকট আড়াল করে রিজার্ভ বৃদ্ধির দাবি: বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই সরকারের বক্তব্য

মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন হ্রাস, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা—সব কিছুই সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অথচ অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্যে “স্বাভাবিক” অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

সরকারের শীর্ষস্থানীয় কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্যে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নত হয়েছে, এবং রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাস্তব অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বিশ্লেষণ বলছে বিপরীত কথা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের “আংশিক তথ্য” দিয়ে সংকট আড়াল করলে ভবিষ্যতে আরও গভীর আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে।

১. মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতি

বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি হয়েছে ৯.৭৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অতিরিক্ত ১,০৮০ কোটি টাকা ছাপিয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

২. বাণিজ্য ও শিল্প খাত

একই সময়ে আমদানি কমে গেছে ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা ৫.৫৮ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। রপ্তানি বেড়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে তা পূর্বের মুলতুবি শিপমেন্টের প্রতিফলন। নতুন অর্ডার কমেছে অন্তত ৫ শতাংশ, ফলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে মোট ৩৫৩টি শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে ও বেকারত্ব বাড়িয়েছে।

৩. জিডিপি ও রাজস্ব প্রবণতা

বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৯ শতাংশ, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি কোভিড মহামারির সময়েও এতটা পতন দেখা যায়নি। নতুন বাজেটেও ২.২৬ লাখ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, এবং রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১.০৫ লাখ কোটি টাকায়।

৪. ব্যাংকিং খাতের অবনতি

২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২.১১ লাখ কোটি টাকা। এক বছরে তা বেড়ে ৪.৫৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মত দিচ্ছেন। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একাধিক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যাংককে ২০,০০০ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার আরও দুর্বলতার ইঙ্গিত।

৫. রিজার্ভ ও ডলারের বাস্তব ছবি

যদিও সরকার রিজার্ভ বাড়ার দাবি করছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন আমদানি কমে যাওয়ার কারণে ডলার ব্যবহারের হার কমেছে, ফলে রিজার্ভে ডলার পড়ে আছে। এটি প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার লক্ষণ।

৬. বাড়তি অর্থপাচার

ট্রেড-বেসড মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার এবং হুন্ডির মাধ্যমে প্রায় ৭.৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এর ফলে দেশে ডলার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

৭. কর্মসংস্থান সংকট

২০২৫ সাল একাই প্রায় ১১ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে। অন্যদিকে বিদেশে কর্মসংস্থান কমেছে ২৭ শতাংশ। প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) কমার আশঙ্কা রয়েছে।

৮. আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তার সঙ্কট

আইএমএফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারদের প্রকল্প ও ঋণ স্থগিত রয়েছে। অর্থনীতির দিক থেকে এই একটা বড় সংকেত যে সরকারের নীতির ওপর তাদের আস্থা কমে গেছে।

৯. সরকারি ব্যয় সংকট

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে পরে স্থগিত রাখতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহে সরকারের হাতে আছে মাত্র ৩ মাসের অর্থ—যা শঙ্কাজনক।

সার্বিক মূল্যায়ন

বর্তমান অবস্থায় অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই শ্লথগতি ও সংকট দেখা যাচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার পরিবর্তে যদি পরিস্থিতিকে “স্বাভাবিক” বলে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে জনগণ এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাবে—যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুদ্ধ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাবে এই সংকট বাড়ছে। সরকারের উচিত দ্রুত বাস্তবতা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles