বাংলাদেশজুড়ে লকডাউন উত্তেজনা, ইউনুস সরকারকে চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের

শেখ হাসিনার আহ্বানে বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী লকডাউন পালিত; ঢাকায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থক জঙ্গিরা। বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা—প্রশ্নের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা।

আওয়ামী লীগের ডাকা বৃহস্পতিবারের “লকডাউন” কর্মসূচি দেশজুড়ে স্বতস্ফুর্তভাবে পালিত হয়েছে। এই সাফল্য মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির প্রবল প্রতাপে ঘুরে দাঁড়ানোর এবং বর্ধিত জনসমর্থনের সুস্পষ্ট নজির তৈরি করল।

মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এবং দমন পীড়ন চালিয়ে যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তা এখন নতুন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দৃশ্য তৈরি করছে। একদিকে শেখ হাসিনার আহ্বান; অন্যদিকে সেনাবাহিনী–সমর্থিত সরকারের কঠোর নজরদারি—এই দুই শক্তির মুখোমুখি অবস্থান সামনের রাজনীতিকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত করে তোলার ইঙ্গিত।

ঢাকা শহর কার্যত থমকে যায়

বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকায় অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে। সাধারণত ভোর থেকেই জনাকীর্ণ সড়কগুলো রীতিমতো ফাঁকা। গণপরিবহন ছিল সীমিত, যাত্রীরা বিপাকে, আর অনেকেই অফিসে না গিয়ে ঘরে বসেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–বঙ্গবন্ধু সেতু কিংবা বিমানবন্দর সড়কের মতো ব্যস্ত মহাসড়কেও ছিল একই দৃশ্য।

স্কুল–কলেজগুলো করোনা অতিমারির সময়ের মতো অনলাইন পরীক্ষা ও ক্লাস চালু করে। অভিভাবকদের বড় অংশ সন্তানদের বাইরে যেতে দেননি। ফলে শহরজুড়ে তৈরি হয় সত্তিকারের লকডাউন পরিবেশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অফলাইনে মানুষের মুখে মুখে ছিল আওয়ামী লীগের সফল কর্মসূচির আলোচনা।

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুর

আওয়ামী লীগের এই প্রবল প্রতাপে ঘুরে দাঁড়ানোকে সহজভাবে নেয়নি মুহাম্মদ ইউনুসের সমর্থক উগ্র মৌলবাদী গ্রুপগুলো। তারা আবারও সন্ত্রাসের পথ বেঁছে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেছে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় গতকাল হামলা চালিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য আরেকদফা ভাঙচুর করেছে।

দুপুরের দিকে তারা রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঝটিকা হামলা চালায়। আগুন লাগিয়ে দেয় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা বহুতল ভবনটিতে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের ভেতরে। হামলাকারীরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় ইসলামী ছাত্রশিবির–সংক্রান্ত স্লোগান দিতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে আসে।

অগ্নি সংযোগের পর সেখানে বসে তারা দলীয় সঙ্গিত গাইতে শুরু করে, যারা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। হামলার পুরো সময় নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলের আশপাশেই ছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভয়েসকে বলেছেন, “এটা কোনো আকস্মিক হামলা নয়। পরিকল্পিত সন্ত্রাস। সরকার চাইলেই এই হামলা ঠেকাতে পারত।”

চকচকে ঢাকা নয়—ঝাঁপসা আতঙ্ক

শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে আরেক ধরনের ভয়। টিএসসি এলাকা, শাহবাগ, হাতিরপুল, নিউমার্কেটসহ কয়েকটি স্থানে সরকারপন্থী এনসিপি ও জামায়াত–শিবিরের কর্মীদের রাস্তায় টহল দিতে দেখা গেছে। তারা পথচারীদের ফোন চেক করেছে—কে কী ভিডিও করছে, কে কোন পোস্ট শেয়ার করেছে, এসব খুঁটিয়ে দেখেছে।

এক রিকশাচালককে মারধর করে পুলিশে তুলে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিপন্ন এলাকায় এক নারীও হামলার শিকার হন। তিনি বঙ্গবন্ধু ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখতে গিয়েছিলেন।

নির্জন আমিন খান নামে ১৪ বছরের এক কিশোর ধ্বংসকৃত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের ইট সংগ্রহ করছিল বলেই তাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

ঢাকার বাইরে—ট্রাক পুড়ে যায়, মহাসড়ক অবরুদ্ধ

রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতি ছিল আরও টানটান। গোপালগঞ্জে সরকারি একটি অফিসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। ফারিদপুরের ভাঙ্গায় ঢাকা–খুলনা মহাসড়কে টায়ার পুড়িয়ে রাস্তা অবরুদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতুর কাছে একটি ট্রাক আগুনে পুড়ে যায়। ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঘন্টার পর ঘন্টা যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

টাঙ্গাইলেও ঢাকা–জামুনা সেতুর মহাসড়কে রাতের অন্ধকারে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যাত্রীরা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এই সব ঘটনাই বলে দিচ্ছে—আওয়ামী লীগের ‘লকডাউন’ কর্মসূচি শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল কিংবা উত্তরাঞ্চল—সবখানেই ছিল তীব্র উত্তাপ।

রাজনৈতিক পটভূমি—দুই শক্তির সংঘর্ষ

গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বধীন সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করার পর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তী সরকার নানা ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া—আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার।

আওয়ামী লীগ দাবি করছে—এটি রাজনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা। এছাড়া দলটি অভিযোগ করছে সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সমর্থনে একটি ‘সংখ্যালঘু–বিরোধী ও প্রগতিশীলতা–বিরোধী’ প্রশাসন গড়ে উঠেছে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া—কঠোর ভাষায় সতর্কতা

অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করছে—এটি “রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা” সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং তারা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য। যৌথ বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কিন্তু সমালোচকদের মতে—যে সরকার আইন–শৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলে, সেই সরকারের সামনেই যদি দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দিবালোকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে সরকারের সক্ষমতা নয়, অভিপ্রায় নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

বৃহস্পতিবার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এইদিন আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে—দলটি নিষিদ্ধ হলেও পরাজিত হয়নি। জনসমর্থন এখনও দৃঢ়। একই সঙ্গে সরকারও বুঝেছে—শেখ হাসিনাকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল এত সহজ নয়।

আপাতত পরিস্থিতি উত্তপ্ত। আরও চার দিনের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। সরকার যদি সংলাপের পথে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহগুলো বাংলাদেশকে আরও অনিশ্চিত এক রাজনৈতিক অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এ সঙ্কট কোনদিকে যাবে—তা এখন দেশের ১৮ কোটি মানুষের দৃষ্টি।

spot_img