৬ষ্ঠ ইসলামিক সলিডারিটি গেমস থেকে রৌপ্য জিতে দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের টেবিল টেনিসের নতুন তারকা জুটি—খই খই সাই মারমা ও মো. জাভেদ আহমেদ। শুক্রবার দেশে পৌঁছানো এই দুই প্যাডলারকে অভিনন্দন জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া সংগঠক থেকে শুরু করে টেবিল টেনিস ফেডারেশনের কর্মকর্তারা।
এই রৌপ্যপদক শুধু একটি সাফল্য নয়—বাংলাদেশের টেবিল টেনিস ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
শক্ত লড়াই পেরিয়ে ফাইনালে
টুর্নামেন্টের পুরো পথটাই ছিল বাংলাদেশের এই জুটির জন্য চ্যালেঞ্জে ভরা। কোয়ার্টার ফাইনালে মালদ্বীপকে হারিয়ে তারা দুর্দান্ত ছন্দে সেমিফাইনালে ওঠেন। সেখানে প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী বাহরাইন জুটি—রাশেদ ও কেন্ডা মোহাম্মদ।
ম্যাচটি শুরু থেকেই রোমাঞ্চ ছড়িয়ে যায়। খই খই ও জাভেদ প্রথম গেমে ১৩-১১ পয়েন্টে জিতে বাড়তি আত্মবিশ্বাস পান। কিন্তু পরের গেমে বাহরাইন ১১-৭ এ জিতে ম্যাচে সমতা ফেরায়।
তৃতীয় গেমটি ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। দুই দলই পয়েন্টে পয়েন্টে লড়ে গেলেও ১২-১০ এ গেমটি জিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। চতুর্থ গেমে আর পেছনে তাকাতে হয়নি—১১-৩ ব্যবধানে জিতে তারা নিশ্চিত করেন ফাইনাল এবং সর্বনিম্ন রৌপ্যপদক।
ফাইনালে অভিজ্ঞ তুরস্ক
ফাইনালের চ্যালেঞ্জ ছিল আরও কঠিন। প্রতিপক্ষ তুরস্কের সিবেল আলতিনকায়া ও ইব্রাহিম গুন্দুজ—দুজনই ইউরোপিয়ান সার্কিটে অভিজ্ঞ এবং উচ্চমানের খেলোয়াড়।
বাংলাদেশ চেষ্টা করলেও তুরস্কের ধারাবাহিক আক্রমণ থামাতে পারেনি। ৩–০ সেটে (৫–১১, ৮–১১, ৬–১১) ফাইনাল হারতে হয় তাদের। তবু দেশের টেবিল টেনিসে এই সাফল্যের গুরুত্ব কম নয়।
বাংলাদেশ টেবিল টেনিসে নতুন দিগন্ত
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে এবার পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট কয়েকটি ব্রোঞ্জ জিতলেও টেবিল টেনিসে কখনও ফাইনালে ওঠার কীর্তি ছিল না। খই খই ও জাভেদের এই পদক তাই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল।
বাংলাদেশে টেবিল টেনিস বরাবরই অবহেলিত একটি খেলা—ভালো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি, মিডিয়া কাভারেজের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে খেলাটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। কিন্তু রৌপ্যপদক এনে দিয়ে খই খই ও জাভেদ প্রমাণ করলেন—সুযোগ পেলে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিসে সাড়া জাগাতে সক্ষম।
খেলোয়াড়দের পথচলার গল্প
খই খই সাই মারমা—পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা প্রতিভা। অল্প বয়সেই আঞ্চলিক পর্যায়ে দাপট দেখিয়ে তিনি জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। তার গতি, প্রতিক্রিয়া এবং মানসিক দৃঢ়তা তাকে বিশেষ করে তোলে।
অন্যদিকে জাভেদ আহমেদ জাতীয় ক্যাম্পে বহু বছর ধরে অনুশীলন করছেন। বল নিয়ন্ত্রণ, সার্ভে বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত শান্ত ভাব তাকে দলের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। এই জুটি পরস্পরের শক্তি ও দুর্বলতা খুব ভালোভাবে বুঝে খেলে—যা তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ।
ক্রীড়া অঙ্গনে গুরুত্ব
বাংলাদেশের খেলাধুলায় বৈচিত্র্য আনতে সরকার ও বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা চেষ্টা চালালেও ক্রিকেট, ফুটবল ও শুটিংয়ের বাইরে অন্য খেলায় ধারাবাহিক সাফল্য আসছিল না।
ফলে এই রৌপ্যপদক প্রমাণ করে দিল—সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে অপ্রচলিত খেলাতেও বাংলাদেশ পদক জিততে পারে।
ফেডারেশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের কোচিং, ইনডোর সুবিধা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সামনে কী?
এই জুটি এখন প্রস্তুতি নেবে আসন্ন সাউথ এশিয়ান গেমস, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ভবিষ্যৎ কমনওয়েলথ গেমসকে সামনে রেখে। বিশেষ করে শীর্ষ প্রতিপক্ষদের সঙ্গে বেশি ম্যাচ খেলা, মানসিক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কৌশল শেখা এখন জরুরি।
যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া নয়—এশিয়ার টেবিল টেনিস অঙ্গনেও জায়গা করে নিতে পারে।

