বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের আহ্বান জানালেন ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান

ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান।

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে নির্বাচন—যা জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়।

ব্ল্যাকম্যান, যিনি লন্ডনের হ্যারো ইস্ট আসনের কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য, ১১ নভেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “ইউনুস সরকার আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক সংস্কার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে সেনা ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে, তার পর থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো অভিযোগ করছে—এই সরকারের অধীনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউনুস সরকারের শুরুর দিকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দুই হাজারের বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে—যার মধ্যে ছিল ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, দোকান ভাঙচুর ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা।

লন্ডন ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহল থেকে ইউনুস সরকারের প্রতি নির্বাচন আয়োজনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ অস্থিরতা বাংলাদেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর করবে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর

বব ব্ল্যাকম্যান তাঁর বিবৃতিতে বলেন, “জুলাই মাসের আন্দোলনের পর সংখ্যালঘুরা কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে। সরকারকে তাদের সমাজ ও রাজনীতির সমান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “তাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।”

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন, যা সেনাবাহিনীর সহায়তায় ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বে হয়েছিল, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নেয়। সেসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংসতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহাবস্থানের সংস্কৃতিকে চরমভাবে আঘাত করেছে।

ইউনুস সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতা

বব ব্ল্যাকম্যান তাঁর বিবৃতিতে ড. ইউনুসকে “অত্যন্ত সুনামধন্য ব্যক্তি” বলে উল্লেখ করে বলেন, “তাঁর মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চ প্রত্যাশা এখন তাঁর সরকারের ওপর ন্যস্ত।” তিনি আহ্বান জানান, “বাংলাদেশ যেন পুনরায় রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনার পথে অগ্রসর হয় এবং বৈষম্য ও প্রতিহিংসামুক্ত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে।”

বব ব্ল্যাকম্যানের পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি (পিডিএফ)

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনও ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছে। তারা বলেছে, নির্বাচনের আগে নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশ যখন তার রাজনৈতিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে, তখন লন্ডন থেকে বব ব্ল্যাকম্যানের বার্তাটি স্পষ্ট—দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা সবই নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের সততা ও স্বচ্ছতার ওপর।

spot_img