সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলেও চলতি নির্বাচনে নয়

আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হলেও আগামী নির্বাচন হবে ইউনুস নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে—সংবিধানিক বৈধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার দেশের বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে—কিন্তু স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সংবিধান স্বীকৃত নয় যে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’, তবু চলছে ক্ষমতা

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রশাসনের বৈধতা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ সংবিধানে “অন্তর্বর্তী সরকার” গঠনের কোনো বিধান নেই; নেই ‘প্রধান উপদেষ্টা’ বা ‘উপদেষ্টা’ নামে কোনো পদও। পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় দেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতেন। সেই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হলে মুহূর্তেই ইউনুস সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এমন কোনো নির্দেশনা নেই—বরং সিদ্ধান্তটি এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে সেনাবাহিনী ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমর্থনে টিকে থাকা ইউনুস প্রশাসন অপরিবর্তিত থাকে।
এই সেই সরকার, যারা ২০২৪ সালের আগস্টে তাদের উগ্র কর্মীদের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টে হামলার পর আগের প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিকে সরিয়ে নিজেদের পছন্দের বিচারকদের নিয়োগ দেয়—এবং পুরো ঘটনাই ঘটেছিল সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতে।

 কবে কার্যকর হবে প্রশ্ন

বৃহস্পতিবারের রায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে আবারও দেশের “গণতান্ত্রিক মৌল কাঠামোর অংশ” হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আদালত বলেছে, এটি কার্যকর হবে পরবর্তী নির্বাচনে। ফলে ১৩তম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, যে সরকার কোনো নির্বাচনি ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতা দখল করে আছে।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পটভূমি

১৯৯৬ সালে ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু হয়। সরকারের মেয়াদ শেষে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য এই ব্যবস্থা। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে এই ব্যবস্থায় নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

২০১১ সালে এটি বাতিল করা হলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতের অভিযোগ ক্রমশ জমতে থাকে।

আদালতের রায়ের প্রভাব

সাত বিচারপতির বেঞ্চ বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতভাবে রায় দেয় যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানসম্মত ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে আদালত নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সময়সীমা পিছিয়ে দিয়ে ইউনুস সরকারের বর্তমান পরিকল্পনাকে অক্ষুণ্ণ রাখল।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, “এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। পূর্ণ রায়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।”

রায়ের গুরুত্ব

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যে প্রশাসন ক্ষমতায় এসেছে, তা কোনো পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। সেই সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হওয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এখন আদালতের সিদ্ধান্ত একদিকে ভবিষ্যতের জন্য আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে—এই রায় কার্যত দুই পথ খুলে দিল:
এক, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কাঠামো তৈরি হলো;
দুই, তবে বর্তমান নির্বাচন সেই কাঠামোর বাইরে থেকে যাবে।

চ্যালেঞ্জ যা রয়ে গেল

রায় কার্যকর করতে গেলে কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসবে:

• নির্বাচন কমিশন কি প্রকৃত স্বাধীনতা পাবে?
• তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি হবে?
• বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে?
• প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ কি নিরপেক্ষ হবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম ভয়েসকে বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এটি যদি শুধু কাগজে-কলমে থাকে এবং বর্তমান সরকার যদি এর পথ রুদ্ধ করে, তাহলে দেশ একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করবে।”

শেষ কথা

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আদালতের রায় দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এখনকার ক্ষমতার বাস্তবতা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে—রায় বাস্তবায়নের সদিচ্ছা, নির্বাচন পরিচালনার নিরপেক্ষতা এবং জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষার ওপর।

spot_img