ইউনুস আমলে খ্রিস্টান নিপীড়নের বিশ্ব-হটস্পট হয়েছে বাংলাদেশ: পোপ

অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা ও উগ্রবাদী উত্থানের কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে—ভ্যাটিকানসহ আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র সমালোচনা

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের কারণে দেশটিকে বিশ্বের চারটি ভয়াবহ খ্রিস্টান নিপীড়ন–হটস্পটের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন পোপ লিও চতুর্দশ।

তাঁর এই মন্তব্য সরাসরি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে—শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পর প্রতিষ্ঠিত মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশের প্রশাসন কি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে?

রোমের সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে রবিবারের অ্যাঞ্জেলাস প্রার্থনায় পোপ বলেন, “বিশ্বের নানা স্থানে খ্রিস্টানরা বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। বিশেষ করে আমি ভাবছি বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, সুদান—এবং সেই সব দেশকে, যেখান থেকে প্রায়ই উপাসনালয়ে হামলার খবর আসে।” 

পোপ লিও তাঁর অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) একাউন্টেও প্রকাশ করেছেন। সেখানে চারটি বিপদজনক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম এক নম্বরে উল্লেখ করেছেন তিনি।

পরবর্তীতে ভ্যাটিকান নিউজ–এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এবং CatholicCulture–এ শিরোনামসহ একই বার্তা তুলে ধরা হয়।
পোপের বক্তব্যের অংশ Catholic News Service-এর এক্স পোস্ট–এও শেয়ার করা হয়। ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তের অসংখ্য মিডিয়া, চার্চ প্রকাশনা ও বিভিন্ন খ্রিস্টান সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।

এই চার দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা—একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে ইউনুস সরকারের অধীনে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের ওপর হামলা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে

৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পরপরই সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সংগঠিত হামলার খবর পাওয়া যায়। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, উপাসনালয়—কোনো পবিত্র স্থানই রক্ষা পায়নি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, গত এক বছরে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভিটেমাটি দখল, জোরপূর্বক উচ্ছেদ কিংবা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারও স্বীকার করেছে—  ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১৩৪টি সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগ তারা পেয়েছে। এগুলো আবার বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সংগ্রহ করা তথ্যের বাইরে—যারা দাবি করছে, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি।

বহু সংখ্যালঘু নেতা বলছেন, “যে ভয় আমরা ২০০১ সালে দেখেছি, এখন তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি।”

পোপের বক্তব্যে বাংলাদেশ বিষয়ে এত বড় সংকেত কেন?

বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত ছিল ‘একটি সহনশীল, বহুসাংস্কৃতিক, অসাম্প্রদায়িক দেশ’ হিসেবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিত উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু সরকার পতনের পর প্রশাসনিক শূন্যতা, দুর্বলতা এবং ইউনুস সরকারের ‘নীরব দর্শক’ অবস্থান উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে খোলামেলা অপতৎপরতার সুযোগ করে দিয়েছে—এমনটাই বলছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

পোপ বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করায় বিশ্বমঞ্চে একটি জোরালো বার্তা গেছে— মামুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা।

হাসিনার আগাম সতর্কবার্তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে

নভেম্বর মাসে দ্য উইক–এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন—
ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুত তাহরীরসহ উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঘটছে।

তিনি উল্লেখ করেন: সংখ্যালঘু, নারী, আদিবাসী, এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা দ্রুত বেড়েছে।

তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো হাসিনার লেখা রাজনৈতিক বক্তব্য। কিন্তু পোপের মন্তব্য, আন্তর্জাতিক সংগঠনের পর্যবেক্ষণ, এবং সংখ্যালঘু সংগঠনের বারবার সতর্কতা—সব মিলিয়ে এখন অনেকে বলছেন, তাঁর ঐ সতর্কবার্তা ইউনুসের হাত দিয়ে দেশকে মারাত্মক দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রকৃত তথ্য।

ইউনুস সরকারের অক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যাটিকানের এই বিবৃতি বাংলাদেশের প্রতি কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে। আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই চাইছে— উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, এবং আসন্ন নির্বাচনে উগ্র গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত পরিবেশ।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বাংলাদেশের সেক্যুলার পরিচয়, বহু ধর্মীয় সহাবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—সবই এখন বিপদের মুখে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম ভয়েসকে বলেন, “যখন বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের একজন নিপীড়নের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেয়, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা আর লুকোনোর মতো নেই।”

spot_img