গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে দেশে ফিরব: শেখ হাসিনা

গৌতম লাহিড়ীকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সংকট, অর্থনীতি, জঙ্গিবাদ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন।

শিগগিরই দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর সুস্পষ্ট ঘোষণা “আমি খুব দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উঁচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব।”

দি ভয়েসের অতিথি লেখক, প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুনির্দিষ্ট তারিখ না জানালেও “দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের সার্বিক কল্যানের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব” পালনে তাঁর প্রচেষ্টা ও কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত বাংলাদেশের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। টেলিফোনে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের রেকর্ডকৃত সংলাপ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

প্রশ্ন-১। ১৭ মে আপনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ২০২৬ সালে না হলেও ২০২৭ সালের মধ্যে প্রত্যাবর্তন কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনাঃ ১৭ মে আমার জন্য খুবই আবেগের এবং স্মরনীয় একটি দিন। ৬ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে বাবা, মা, ভাই, আত্মীয় স্বজন সব হারানো আমি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসাকে সম্বল করে দেশে ফিরেছিলাম। তখনও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল, মামলা ছিলো, জীবনের হুমকি ছিলো। তবুও জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দৃড় প্রত্যয় নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র ও শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি ফিরে এসেছিলাম। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিলো। তখন থেকে সেই জনগণই আমার শক্তি। তাদের ভালোবাসাই আমাকে এখনো পথ দেখাচ্ছে।

আপনি ২০২৭ সালের কথা বললেন। দেখুন, প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট দিন তারিখের উপর নির্ভর করে না। আমরা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এটা শুধু আমার প্রত্যাবর্তনের জন্যই নয় বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের সার্বিক কল্যানের জন্যই অপরিহার্য। দেশের জনগণকে এক্যবদ্ধ করে আমরা অচিরেই সেই লক্ষ্যে পৌছাব।

কিন্তু একটি কথা আমি পরিষ্কার ভাবে বলতে চাই, আমার অনুপস্থিতি কিন্তু আমার নীরবতা নয়। আমি প্রতি মুহুর্তে দেশের জন্য লড়ছি, দেশের জনগণকে এই ঘোর অমানিশা থেকে উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছি। কূটনৈতিক পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক আইনী কাঠামোতে এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে সেই ষড়যন্ত্রের স্বরুপ উন্মোচনের জন্য আমাদের কার্যক্রম চলমান। দেশের জনগনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্টেক হোল্ডাররাও সেটা বুঝতে শুরু করেছেন।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী জাতির পিতার সেলের পাশে কবর খুঁড়ে তাকে আপোষ করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তিনি দেশের স্বার্থে কারও কাছে মাথা নত করেননি | আমাকেও ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ এর ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমার দলকে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুই আমাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন অতএব আমি খুব দ্রুতই বাংলাদেশের মাটিতে ফিরব। মাথা উচু করে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার গর্ব নিয়ে ফিরব।

প্রশ্ন২। বাংলার মানুষ আপনাকে বহু বছর সুস্থ-সবল এবং প্রাণবন্ত নেতৃত্বে চায়। আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে কিভাবে প্রত্যাবর্তন সম্ভব?

শেখ হাসিনাঃ আমি শুরুতেই বলেছি দেশের জনগণের ভালোবাসাই আমার মূল শক্তি। আমি সারা জীবন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যন্নোয়নের জন্য কাজ করেছি, সেটা সরকারি দলে থেকে হোক কিংবা বিরোধী দলে। যখনই আমরা ক্ষমতায় এসেছি দেশ ও জনগনের উন্নয়ন করেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের করা উন্নয়নের ফসল দেশের সকল মানুষ ভোগ করছে। মানুষ এখন আরো ভালোভাবে বুঝতে পারছে আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র অবলম্বন। তারাই আমাকে প্রতি মুহুর্তে তাদের প্রার্থনাতে রাখছেন। তাদের এই প্রার্থনা ও ভালোবাসাই আমাকে সুস্থ সবল রেখেছে।

দেখুন, আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। বন্দুকের নলের জোরে কিংবা ক্ষমতার আশীর্বাদ নিয়ে কিংস পার্টি হিসেবে এই দলের জন্ম হয়নি। তাই কোন কাগুজে নিষেধাজ্ঞা এই দলকে কখনোই দমিয়ে রাখতে পারেনা। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খান আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিলো, ১৯৭১ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিলো। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যদি আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখা যেত তাহলে বাংলাদেশেরই জন্ম হতো না।

জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পরও তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখার, ধ্বংস করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ বরাবরই আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী মনে করেছেন তাদেরকে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে বলব। এই নিষেধাজ্ঞা প্রদান ক্ষমতাসীনদের সাময়িক শক্তি প্রয়োগের নিদর্শন হলেও এটি আদতে তাদের ভয়ের প্রতিফলন। তারা আওয়ামী লীগকে ভয় পায় কারণ আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে পারলে তাদের দেশবিরোধী কার্যক্রম চালানো কঠিন হবে। এ কারনেই এই নিষেধাজ্ঞা।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞা দিয়েও কি আওয়ামী লীগকে দমানো গিয়েছে? আমাদের কোটি কোটি সমর্থক, লাখো নেতাকর্মী দেশেই আছে। সকল হামলা, মামলা, জেল জুলুম, নির্যাতন নিম্পেষন সহ্য করেও এক্যবদ্ধ আছে। ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার ও সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের সকল দেশ বিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থকরাই সোচ্চার রয়েছে। এখনো আমার ছাত্রলীগের ছেলেরাই অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তাদের ধান কেটে দিচ্ছে।

আওয়ামীলীগকে দমিয়ে রাখা যায় না, এই দল মানুষের হৃদয়ে বাঁচে, মানুশের ভালোবাসায় বাঁচে। দেশের ও জনগণের স্বার্থেই আওয়ামী লীগের ফিরে আসা অনিবার্য এবং এটা কেবলই সময়ের ব্যাপার। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমরা ফিরব আরো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়ে।

প্রশ্ন-৩। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শুদ্ধিকরণের কথা উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। এর বাস্তবতা আছে কি?

শেখ হাসিনাঃ দেখুন আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। আদর্শিক কর্মীরাই এই দলের প্রাণশক্তি এবং তারাই নির্ধারণ করে নেতৃত্ব। শুদ্ধিকরণ বলেন কিংবা পরিবর্তন-পরিমার্জন বলেন সেটি একটি স্বাভাবিক নিয়মিত প্রক্রিয়া। পৃথিবীর সকল রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে দলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবিশেষের প্রতি অভিযোগ অনুযোগ উঠতেই পারে। আমরা সেটি যথাযথ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করি। আওয়ামী লীগ কখনো কোন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই অন্যায়ের সাথে জড়িত আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপিদেরকেও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।

একই সাথে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে শুদ্ধিকরণ কিংবা রিফর্মের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দল ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করে। অনেকবার এই অপচেষ্টা করা হয়েছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আওয়ামী লীগ নিজেই তার ঘর শুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। এই শুদ্ধিকরণ হবে দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং দলীয় কর্মী ও জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে, ষড়যন্ত্রকারীদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী না।

গৌতম লাহিড়ী

বর্তমানে আমরা একটি প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যারা আদর্শিক নেতা-কর্মী তারা সবাই যার যার অবস্থান থেকে আওয়ামীলীগের পক্ষে, দেশের পক্ষে সোচ্চার আছেন। যারা সকল অত্যাচার নির্যাতন সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছেন তারাই আওয়ামী লীগের মূল চালিকাশক্তি, এরাই প্রকৃত আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে যারা কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আওয়ামী লীগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা ইতোমধ্যেই ভোল পালটে ফেলেছে কিংবা চুপ হয়ে গিয়েছে। আমি দলীয় নেতাকর্মীদের বলবো, আপনারা কেউ হতাশ হবেন না। আগুনে পোড়ে সোনা খাঁটি হয়। বর্তমান কঠিন সময় আপনাদের আরো খাঁটি করেছে। এই আগুনের দিন শেষে আওয়ামী লীগ আপনাদের হাত ধরেই আরো পরিশুদ্ধ এবং শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন-৪। দেশত্যাগী আওয়ামী নেতারা দেশে ফিরবেন কি?

শেখ হাসিনাঃ দেশত্যাগী কথাটার সাথে আমার দ্বিমত আছে। কারণ এরা কেউ স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েনি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর যে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের খাঁড়া নেমে এসেছে তা বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী এবং সমর্থকদের উপর একটি নীরব রাজনৈতিক গণহত্যা চালিয়েছে যা এখনো চলমান রয়েছে।

আমাদের প্রায় ছয় শতাধিক নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিও। দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন পর্যায়ে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করা হয়েছে, পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, দখল করা হয়েছে। হাজারো নেতাকর্মী এখনো কারাবন্দী, জেলের দেয়া হচ্ছে না। জালিম শাসক গোষ্ঠী প্রিয়জনদের জানাজার নামাজ পড়ার সুযোগ পর্যন্ত দিচ্ছে না।

ছাত্রলীগের হাজারো ছেলেমেয়ের ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে, সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে, শিক্ষার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং আওয়ামী লীগের আদর্শ ধারণ করার অপরাধে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি চাকুরি থেকে হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী
করা হচ্ছে।

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রাণে বাঁচতে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকে দলকে সংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে চেষ্টা করছেন, বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনে বাংলাদেশের প্রকৃত সত্য তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে দেশের জনগনের কাছে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন করছেন। ফেরার প্রশ্নে বলতে চাই, দেশে নূন্যতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন ফিরে আসা মাত্রই তারা ফিরবেন।

আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের, তারাই সময়ের সাহসী যোদ্ধা। তারা শত নির্যাতন সহ্য করে দেশের মাটি আকড়ে ধরে আছেন, শত প্রতিকূলতা মাঝেও দলীয় কর্মসূচী পালন করছেন। তাদের এই ত্যাগ ও সংগ্রাম ব্যর্থ হবে না। দল তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে | বিদেশে যারা অবস্থান করছেন তাদেরকেও নিজেদের কর্মের মধ্য দিয়েই দলে অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশ্ন-৫। বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে | আপনার নেতৃত্বে যেসব পরিকাঠামো তৈরি করেছিল তার সুবিধা নিয়েই সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। আপনি নেতৃত্বে থাকলে কিভাবে সংকটের সমাধান হতো?

শেখ হাসিনাঃ আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল ভিত্তিই হলো দেশের জনগনের কল্যাণ নিশ্চিত করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ক্ষুধা-দারিদ্যমুক্ত বৈষম্যহীন সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার মাধ্যমে দেশের গরীব দুখী মেহনতী উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি।

২০০৮ সাল পরবর্তী ১৬ বছর টানা চার মেয়াদে সরকারে থাকাকালীন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যথাযথ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করতে পেরেছিলাম | পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমৃদ্র বন্দর, কর্নফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রজেক্ট আমরা বাস্তবায়ন করেছি। দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করেছি যার ফলে ব্যবসা বাণিজের সম্প্রসারণ ঘটেছে। বিশ্বাদরবারে বাংলাদেশের পরিচিতি ঘটেছে উন্নয়নের রোল মডেল ও এশিয়ার রাইজিং টাইগার হিসেবে।

কিছু পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে। ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের শেষ বাজেট ছিলো ৭০ হাজার কোটি টাকার, মাথাপিছু আয় ছিলো ৪৮২ ডলার এবং দেশের জিডিপির মোট আকার ছিলো ৭০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আমাদের দেয়া সর্বশেষ অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালের বাজেটের আকার ছিলো ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকার, মাথাপিছু আয় ছিলো ২৭৮৪ ডলার এবং জিডিপি ছিলো ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে আমরা দেশের অর্থনীতিকে কতটা সুদৃঢ় করতে পেরেছিলাম, যার সুফল ভোগ করেছে দেশের সাধারণ জনগণ।

কিন্ত একটি মেটিক্যুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়েছে একের পর এক কল-কারখান, বেকার হয়েছে লাখো মানুষ। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি কারণে বিদেশী বিনিয়োগ নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দেড় বছরের শাসনামলে কোন উন্নয়ন তো করেইনি বরং আমাদের সময়ে নেয়া অনেক প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করেছে। মাত্র দেড় বছরে দেশী ও বিদেশী উৎস থেকে খণ করেছে ৩ লক্ষ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এই ধারবাহিকতা চলমান তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলেও। মাত্র তিনমাসেই তারা খণ করেছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতি আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে। বিদ্যুৎ নেই, তেল নেই, গ্যাস নেই, সার নেই, সেচের পানি নেই। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় মানুষের আয় কমেছে অন্যদিকে বাজারে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। সবমিলিয়ে মানুষ এক দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এবার আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসি, আমি থাকলে কিভাবে এই সংকটের সমাধান হতো ৷ আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আমি সরকারের দায়িত্বে থাকলে এই পরিস্থিতিই হতো না। ২০০৯ সালে আমরা যখন সরকার গঠন করি তখন এক ভগ্নপ্রায় অর্থনীতির বাংলাদেশ পেয়েছিলাম, বিশ্বে তখন চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলছিলো | সেই অবস্থা থেকে আমরা দেশকে টেনে তুলেছি।

আওয়ামীলীগ সরকার দায়িত্বে থাকাকালীন আমরা পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ কোভিড মোকাবেলা করেছি। দেশের জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতে দেইনি। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের মুল লক্ষ্যই হলো জনগণের কল্যাণ। অন্যদিক ইউনুস ক্ষমতা দখল করেছিল নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সে সেটাই করেছে। তারেক রহমানও সেই কাজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার মুচলেকা দিয়েই সমঝোতার মাধ্যমে সরকারে বসেছে। আর তাই আজ দেশের এই করুণ পরিস্থিতি।

প্রশ্ন-৬। বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। আপনি যে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তার সুযোগ বর্তমান সরকার নিতে পারছে না কেন?

শেখ হাসিনাঃ প্রতিটি শিশুর মৃত্যু আমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। আমি একজন মা, অসহায় বাবা মায়ের আর্তনাদ নিত্য আমার কানে বাজে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো এই শিশুরা এমন একটা রোগে মারা যাচ্ছে তা আমরা প্রায় নিল (শূণ্য) করার পর্যায়ে ছিলাম এবং সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালেই আমরা বাংলাদেশকে হাম মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করতাম। অথচ অসৎ উদ্দেশ্য ও ব্যক্তিস্বার্থে অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের নতুন পদ্ধতি চালু করতে গিয়ে টিকাদান কর্মসূচির বিঘ্ন ঘটায়। আর বর্তমান সরকারের অদক্ষতা ও উদাসীনতার কারনে এই রোগ মহামারী রুপে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশের ৬১ টি জেলায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি শিশু এই রোগে আক্রান্ত, মারা গিয়েছে ছয় শতাধিক শিশু। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে এই লাশের সারি। এটি কোন দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি প্রশাসনিক অপরাধ।

আমার শাসনামলে আমরা দেশের স্বাস্থ্যখাতের অভাবনীয় সব উন্নয়ন ঘটিয়েছি। ১৪ হাজারর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগনের দৌরগোঁড়ায় পৌছে দিয়েছিলাম। ইপিআই এর মাধ্যমে UNICEF এবং GAVI এর সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিশুদের সংক্রামক রোগসমূহকে প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলাম। বাংলাদেশের ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম ছিলো সারা বিশ্বের জন্য রোল মডেল, যার স্বীকৃতি হিসেবে GAVI আমাকে ভ্যাকসিন হিরো সম্মাননা দিয়েছে। আমাদের সময় মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার ছিলো দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে সবচেয়ে কম।

আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, বৈশ্বিক কোভিড মহামারীর সময়েও একান্তিক প্রচেষ্টা সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং সেটির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা অত্যন্ত সফলতার সাথে তা মোকাবেলা করতে পেরেছিলাম। চরম প্রতিকূল সেই পরিস্থিতিতেও দ্রুততম সময়ে টেস্ট সেন্টার স্থাপন, যথাযথা চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতসহ জনগনের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করেছিলাম। ফলে কোভিডে আমাদের দেশের আনুপাতিক মৃত্যু হার ছিল বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়ে কম। আর এটা সম্ভব হয়েছিলো আমাদের জনকল্যানমুখী রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার ফলে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা সর্বশেষ যে বাজেট দিয়েছিলাম তাতে স্বাস্থ্যখাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো। অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো টিকাদান কর্মসূচি নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য। অথচ অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার UNICEF এবং WHO এর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নিয়মিত টিকাদান ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল করে। শুধু টিকাদান কর্মসূচীই নয় পুরো স্বাস্থ্য খাতকেই তারা ধ্বংস করেছে। শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন এ ক্যাপসুল পর্যন্ত দেয়া হয়নি। সরকারি হাসপাতাল সমূহে জরুরি চিকিসা সামগ্রীর সরবরাহ নেই। নেই জলাতঙ্ক ও সাপে কাটার ইনজেকশন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন কার্যক্রমও প্রচন্ডভাবে বিঘ্ন ঘটেছে। কোভিড কালীন সময়ে আমরা দেশের ৪২ টি জেলায় আইসিইউ সুবিধা স্থাপন করেছিলাম। মেইনটেইনেন্সের অভাবে সেগুলো অকেজো করে ফেলে রাখা হয়েছে। যার ফলে আজ অসহায় শিশুদের করুণ মৃত্যু আমাদের
দেখতে হচ্ছে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা সত্বেও কেন টিকাদান কর্মসূচীতে বিঘ্ন ঘটানো হলো? কেন হাসপাতালসমূহে চিকিৎসা সামগ্রীর অভাব? বাজেটের ৪২ হাজার কোটি টাকা তাহলে গেলো কোথায়? বর্তমান সরকারও এসবের তদন্ত না করে আওয়ামী লীগকে দোষারোপের জন্য মিথ্যাচারে ব্যস্ত। অথচ মার্চে যখন হামের সংক্রমণ দেখা দিলো তখনো যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এটার বিস্তার ঠেকানো যেত, শিশুদের অকাল মৃত্যু কমিয়ে আনা যেত। কিন্তু তারা জনগণের কথা ভাবে না, শিশুদের মৃত্যু তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায় না। সবকিছুই তাদের কাছে রাজনৈতিক মিথ্যাচারের উপকরণ। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, হামে শিশুদের মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রতিটা ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে। জনগণ একদিন এর বিচার করবে।

প্রশ্ন-৭। জেলবন্দী নেতা ও সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

শেখ হাসিনাঃ ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে দেশের বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, মব করে দেশের সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্ট ও হাইকোর্টে নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়কারীদের। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির আর একটিও নেই। আমাদের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এমনকি সংখ্যালঘুয সম্প্রদায়ের নেতাদের মিথ্যা মামলায় বিনা বিচারে মাসের পর মাস কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তাদেরকে নূন্যতম আইনী অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
আইনজীবীদের। আদালত কক্ষেই মব করা হচ্ছে। এমনকি আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে দেয়া হয়নি। যে বিচার ব্যবস্থা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সেটাকেই বানানো হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার।

এতো বাঁধা বিপত্তি ও প্রতিকূলতা সত্তেও আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য দেশে ও বিদেশে আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্টার পার্লামেন্টারী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনসমূহে আমরা নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠীাচ্ছি, যোগাযোগ করছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আমাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও সেসব দেশের সরকারের নিকট বাংলাদেশের বর্তমান বিচারহীনতার বিষয়টি তুলে ধরছে, কারাবন্দীদের মুক্তির দাবীতে নিয়মিত প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করছে।

আমি বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আমাদের দেশের জনগণের প্রতি আহবান জানাই, আপনারা দেশের বিচারব্যস্থার এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সরব হোন। এটি কোন নৈমিত্তিক কিংবা রাজনৈতিক বিষয় নয়। এটি মৌলিক মানবাধিকারের সাথে সম্পৃক্ত। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলমান থাকলে তা শুধু আওয়ামী লীগ নয় সকলকেই ভুক্তভোগী করবে। জনগনকে সাথে নিয়েই আমরা এই বিচারহীনতার শৃঙ্খল সরিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করব।

প্রশ্ন-৮। বর্তমান সরকার ভারত বিরোধী জিকির তুলে চীন ও পাকিস্তানের সাথে সখ্যতা বাড়াচ্ছে। এটা আপনি কীভাবে দেখছেন? জঙ্গীবাদ আপনি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এখন কি জঙ্গীবাদ প্রশ্রয় পাচ্ছে?

শেখ হাসিনাঃ দেখুন আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয় হচ্ছে, সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়। আর এই বন্ধুত্ব স্থাপনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনকল্যাণ এবং মূল ভিত্তি হচ্ছে ন্যায্যতা ও সাম্য। এই নীতি আমাদের সংবিধানেই প্রথিত রয়েছে। দেশের জনগণের স্বার্থে আওয়ামী লীগ সম্পর্ক জারি রেখেছে, এবং তারাও আমাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। একারণে আমরা বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন করতে পেরেছিলাম।

ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক এতিহাসিক। ভারত কেবল আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাদের দেশে আদর্শিক ভিত্তিহীন স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম হাতিয়ার হলো ভারত বিরোধিতা। এটি তাদের রাজনীতির অন্যতম উপকরণ | তাই তারা হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত এই ভারত বিরোধিতার চর্চা করে। ডঃ ইউনুসের নেতৃত্বে অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারও এতে যোগ দিয়েছিল।

আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিরা সবসময় অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে, দেশবিরোধি চুক্তি করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং বর্তমান সরকারের সময়ে এমন দেশবিরোধী একটি চুক্তিও তারা হাজির করতে পারেনি। তাদের এই মিথ্যাচার এখন জনগণ বুঝতে পেরেছে।

একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, জাতির পিতার হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আমরা গঙ্গার পানি চুক্তি করেছিলাম। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে সমৃদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আমরা ভারতের কাছ থেকে প্রায় ২০ হাজার বর্গ কিঃমিঃ সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ করেছিলাম। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক ল্যাণ্ড বর্ডার এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে দুই দেশের ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করেছিলাম। এছাড়াও আমাদের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ট্রাসশিপমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করেছিলাম। আমরা যে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন স্থাপন করেছিলাম সেটিই এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানিখাতের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে কাজ করছে।

অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সর্বদাই স্বচ্ছতার সাথে জনগনের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আওয়ামীলীগ কখনোই অন্য কোন রাষ্ট্রের তাবেদারি করেনি কিংবা দেশবিরোধী চুক্তি করেনি।

কিন্তু ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময়েও আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। দেশের জনগণ ইতোমধ্যেই এটি বুঝতে পেরেছে বলে আমার বিশ্বাস।

আপনি জঙ্গীবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। এটি কেবল বাংলাদেশ নয় আমাদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অন্যতম হুমকি। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০০১-০৬ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ জঙ্গীবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। দেশের ৬৩ জেলায় এক যোগে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল, আমার উপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল৷ জঙ্গী হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে বিচারকের, আক্রান্ত হয়েছে দেশের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়। ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীও জঙ্গী আক্রমনের শিকার হয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে দশট্রাক অবৈধ অস্ত্র আমদানির মতো ঘটনা ঘটেছিল।

আমরা ক্ষমতায় এসেছে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে দেশকে জঙ্গীবাদ থেকে মুক্ত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলাম। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর আধুনিকায়ন, জঙ্গিবাদ নির্মূলে বিশেষায়িত সেল গঠন ও যথাযথ নজরদারি মাধ্যমে জঙ্গিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলাম। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের উত্থানের কারণে আমাদের ক্ষমতায় থাকার সময়ে হলি আর্টিজানের মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটলেও আমরা এর সাথে জড়িতদের চিহিত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম। যার ফলে বাংলাদেশ জঙ্গীবাদ মুক্ত নিরাপদ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল।

কিন্তু ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম কারাগারে আটক দন্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ জঙ্গীদের মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। জেল পলাতক জঙ্গীদের আটকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই দেশে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটতে থাকে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনসমূহ প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। জঙ্গী কার্যক্রম ও সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত দন্ডপ্রাপ্ত অনেকেই সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে জন প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে গিয়েছে। অর্থাৎ দেশে আরেকটি ২০০১-০৬ সময়ের অন্ধকার সময়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। জঙ্গীবাদের কালো থাবা ছড়িয়ে পড়েছে সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাঝেও। এটি নিঃসন্দেহে দেশের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।

আরেকটি ভয়াবহ ব্যাপার হলো, জঙ্গীবাদ নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অনেককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে, মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে, প্রতিনিয়ত হয়রানী করা হচ্ছে। একদিকে জঙ্গীবাদের সাথে জড়িতরা মুক্তি পেয়ে প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে, অন্যদিক জঙ্গীবাদের নির্মূলে ভূমিকা রাখা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় হয়রানীর শিকার। এটাই প্রমাণ করে ২০২৪ এর আগস্ট পরবর্তী সময়ে সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটে চলেছে।

প্রশ্ন ৯। বিশ্বের বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা সংগঠনের সহযোগিতা চাইছেন কি যাতে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে উঠতে পারে?

শেখ হাসিনাঃ বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বেআইনী নিষেধাজ্ঞা প্রদানের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে নিম্পেষণমূলক ও ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছে ক্ষমতাসীনরা। এটি কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। একের পর এক সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে আর নিরপরাধদের কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে দেশের নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ধর্ষণ মহামারী রুপ নিয়েছে। জঙ্গীবাদ চোখ রাঙীচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে দেশের আবহমান সংস্কৃতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ ভুলুণ্ঠিত। সংসদে বসে অট্টহাসি দিচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী। বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে, বিতর্কিত পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশকে একঘরে করে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। এই অবস্থা চলতে পারে না।

আমি বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সংগঠনসমূহের সহযোগিতা চাই। আমি তাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই, বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে তা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষোয় নয়। এর সাথে মৌলিক মানবাধিক ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রশ্ন জড়িত। বাংলাদেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হলে, মৌলবাদী রাষ্ট্র কায়েম হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু থাকলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশের ১৮ কোটি মানুষ– যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর। সকলের প্রতি আমার আহবান থাকবে আপনারা বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা করুন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা আইনের শাসন কোন সিলেক্টিভ বিষয় নয়। একটি অন্তভূক্তিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মান করতে হলে সকলের জন্যই এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করা আবশ্যক। সময় এসেছে আপনাদের প্রকৃত সত্যের পাশে দাঁড়ানোর |

বাংলাদেশের মানুষের কাছে আমার বার্তা আপনার হতাশ হবেন না। আপনাদের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আওয়ামী লীগ ফিরবে। গণতন্ত্র ফিরবে। সুশাসন ফিরবে। একটি গণতান্ত্রিক, অন্তভূক্তিমূলক, মৌলবাদমুক্ত, সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মী লড়াই চালিয়ে যাবে। জেল,জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, ক্যাঙ্গারু কোর্টের রায় কিছুই আওয়ামী লীগকে দমাতে পারবে না। সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আবার বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles