ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ প্রবল হচ্ছে, জাবি প্রশাসনিক ভবনেও তালা

পাঁচ দিনেও অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; প্রক্টরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার পর প্রশাসনিক ভবনে তালা, তদন্ত কমিটি গঠন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। প্রক্টর কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে প্রক্টরকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার একদিন পর এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনেও তালা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে না পারাকে তারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘চরম ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

রোববার সকাল ১০টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ রাখা হবে।

‘১০০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার নেই’

আন্দোলনে অংশ নেওয়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আদৃতা রায় সাংবাদিকদের বলেন,
“১০০ ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের কোনো খবর নেই। এতে প্রশ্ন ওঠে, প্রশাসন আদৌ তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে কি না।”

তিনি আরও বলেন,
“আমাদের ছয় দফা দাবির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা। প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই আমরা প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়েছি।”

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রশাসন ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। অভিযুক্তকে ধরতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ছে।

কী ঘটেছিল সেদিন রাতে

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও শিক্ষার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (১২ মে) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেখানে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করে।

একই দিন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তারা স্পষ্ট করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার না হলে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করা হবে।

কিন্তু আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক রাশিদুল আলমকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা এবং তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন।

তদন্ত কমিটি গঠন

ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের মুখে শনিবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

গঠিত তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. সোহেল রানাকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাহিদ আখতার, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন সুলতানা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান এবং দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. জহির রায়হান।

কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার উপ-রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ।

তবে তদন্ত কমিটি গঠনকে অনেক শিক্ষার্থী যথেষ্ট মনে করছেন না। তাদের বক্তব্য, তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো উদ্বেগ আবার সামনে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাস, নির্জন সড়ক এবং বনাঞ্চলঘেরা বিভিন্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় রয়েছে।

বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে অতীতেও একাধিকবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার অভাব, নির্জন এলাকায় টহলের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বহুবার অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রায়ই ঘটনাগুলোর পর তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, শুধু এই একটি ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বেড়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা রাতের বেলায় চলাফেরায় আতঙ্ক অনুভব করছেন।

উত্তেজনা বাড়ছে ক্যাম্পাসে

রোববার প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ার পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন বিভাগ ও আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হলে এবং তাদের দাবিগুলো পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতার কোনো ঘোষণা আসেনি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়নি।

এদিকে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রশাসনিক আশ্বাসের চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি। তাদের মতে, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামার সম্ভাবনা কম।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles