নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সেলিনা হায়াৎ আইভির মুক্তির পথ কার্যত খুলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে দায়ের করা শেষ দুই মামলাতেও তার জামিন বহাল রাখায় এখন তার কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
রোববার চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা পৃথক লিভ টু আপিল আবেদনের শুনানি শেষে ‘নো অর্ডার’ দেন। এর ফলে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশ বহাল থাকে। এর আগে বিভিন্ন ধাপে মোট ১২টি মামলায় আইভির জামিন নিশ্চিত হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সব মামলাতেই তার জামিন কার্যকর হলো।
আইভির আইনজীবী হৃদয় রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “সব মামলায় জামিন বহাল থাকায় আমরা আশা করছি, চলতি সপ্তাহেই তিনি কারামুক্ত হবেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের মাধ্যমে জামিনের আদেশগুলো কারাগারে পৌঁছানোর পর মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।”
প্রায় এক বছর কারাগারে
সেলিনা হায়াৎ আইভিকে ২০২৫ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে তাকে তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যা চেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নিম্ন আদালতে জামিন না পেয়ে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন এবং ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট তাকে জামিন দেন।
কিন্তু আইনজীবীদের অভিযোগ, ওই মামলাগুলোতে জামিন পাওয়ার পরপরই তাকে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যাতে তিনি কারাগার থেকে বের হতে না পারেন।
আইভির আরেক আইনজীবী এস এম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “তিনি প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে আছেন, যদিও একের পর এক মামলায় আদালত জামিন দিয়েছেন। প্রতিবার জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এটি শুধু আইনি বিষয় নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মামলাগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
ধারাবাহিক নতুন মামলা নিয়ে প্রশ্ন
আইভির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বেশিরভাগই ২০২৪ সালের সহিংস আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে দায়েরকৃত বিভিন্ন হত্যা মামলা ও আওয়ামী লীগের উপর দমন-পীড়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে, যদিও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মামলা, গ্রেপ্তার ও পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইভি জামিন পাওয়ার পরপরই তাকে অন্তত সাতটি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে তিনি মামলার এজাহারেও নামভুক্ত ছিলেন না।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, কোনো আসামি জামিন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন মামলায় ধারাবাহিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রবণতা বিচারিক প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করছে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
গত ২০ এপ্রিল হাইকোর্ট আইভির করা এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে নির্দেশ দেন, নির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাকে যেন গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা না হয়। পরে ২৬ এপ্রিল আদালত আরও নির্দেশ দেন, যেসব মামলায় তার নাম নেই সেখানে তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না, যদি না পুলিশ রেকর্ডে তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে। একই সঙ্গে নতুন কোনো নামবিহীন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়।
আদালতের এ পর্যবেক্ষণকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক আইনজীবী। তাদের মতে, এটি ইঙ্গিত করছে যে, একই ব্যক্তিকে ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলায় জড়ানোর বিষয়টি আদালতের নজরেও এসেছে।
আপিল বিভাগের আগের আদেশ
গত ১০ মে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ পাঁচটি মামলায় হাইকোর্টের জামিন আদেশ বহাল রাখেন এবং আরও পাঁচটি মামলায় স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে ওই মামলাগুলোর রুল ছয় সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে আবারও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে গেলে সর্বশেষ দুই মামলার জামিন নিয়েও শুনানি হয়। রোববারের আদেশে সেই পথও বন্ধ হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভির অবস্থান
সেলিনা হায়াৎ আইভি দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্যেও তিনি একাধিকবার নির্বাচিত মেয়র হন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার জন্য আলোচিত ছিলেন।
তার গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাস নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। সমর্থকদের দাবি, তাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখতেই একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রায় এক বছরেও অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া এবং ধারাবাহিক নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনাকে ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আইনজীবী মহল ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মধ্যে।

