মতলব প্লাজা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি পদ ‘দখলের’ অভিযোগ

নির্বাচন ছাড়াই বিএনপি নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে পবনকে সভাপতি ঘোষণা ঘিরে উত্তেজনা; উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, মারধরের দাবি ব্যবসায়ীদের

ঢাকার অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তিপণ্য ও মোবাইল আনুষঙ্গিক পণ্যের মার্কেট মতলব প্লাজা দোকান মালিক সমিতিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খন্দকার আখতার হামিদ খান পবনের বিরুদ্ধে নির্বাচন ছাড়াই সমিতির সভাপতি পদ ‘দখল’ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শনিবার সন্ধ্যায় পবন ও বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি শাহ আলম প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে মতলব প্লাজায় প্রবেশ করেন। এ সময় নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলে এর বিরোধিতা করেন অনেক দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বহিরাগত বিএনপি কর্মীরা কয়েকজন ব্যবসায়ীকে মারধর করে বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনার পর মতলব প্লাজা দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহবুবুর রহমান বাচ্চু রোববার ভোরে শাহবাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে পবন, শাহ আলম এবং অজ্ঞাতনামা ১০০-১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মাহবুবুর রহমান বাচ্চু সাংবাদিকদের বলেন, “শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই পবন ও শাহ আলম সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেও তারা একই ধরনের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তখন ব্যর্থ হন।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের নাম ব্যবহার করে এ কমিটি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যদিও মির্জা আব্বাস বর্তমানে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন।

বাচ্চুর ভাষ্য, “পবন ও তার সঙ্গে আসা বহিরাগতরা ব্যবসায়ীদের মারধর করেছে এবং আমাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে।”

পবনের পাল্টা দাবি

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খন্দকার আখতার হামিদ খান পবন। তিনি দাবি করেছেন, মির্জা আব্বাসের সম্মতিতেই ৩১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেখানে তাকে সভাপতি ও শাহ আলমকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

পবন সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস ও তার ব্যক্তিগত সহকারী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিটি গঠনের বিষয়ে সম্মতি দেন।”

তিনি আরও দাবি করেন, বিরোধী পক্ষই প্রথমে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং তাকে ও শাহ আলমকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয়।

পবনের অভিযোগ, “বাচ্চু ও তার লোকজন বলেছে, তারা মির্জা আব্বাসের সম্মতিতে গঠিত কোনো কমিটি মানবে না। তারা বাজারে আগুন লাগিয়ে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছে।”

পবন আরও দাবি করেন, তার পক্ষ থেকেই প্রথমে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, পরে বাচ্চুর পক্ষ পাল্টা অভিযোগ করে।

পুলিশ যা বলছে

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার এস কে জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, উভয় পক্ষই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল ও অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করেছি। আপাতত নিয়মিত মামলা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই পক্ষকেই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সমাধান না হলে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন দেওয়া হতে পারে, কারণ ঘটনাটি মূলত হাতাহাতি ও সংঘর্ষের পর্যায়ে রয়েছে।”

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, মির্জা আব্বাসের ব্যক্তিগত সহকারী মিজানুর রহমান সোহেলের সঙ্গেও ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, পরিবহন সমিতি, পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এসব সংগঠনের নেতৃত্ব দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাত আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় সেনা-সমর্থিত ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীঘনিষ্ঠ অন্তর্বর্তী প্রশাসন ক্ষমতায় ছিল। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার গঠন করে। তবে নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক তৈরি হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির অভ্যন্তরেও প্রভাব বিস্তার ও স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। মতলব প্লাজার ঘটনাকে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকে।

মতলব প্লাজা রাজধানীর অন্যতম বড় প্রযুক্তিপণ্য ও মোবাইল ফোন আনুষঙ্গিক সামগ্রীর বাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো ক্রেতা ও ব্যবসায়ীর আনাগোনায় মুখর এ মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে অতীতেও একাধিকবার বিরোধ ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles