২২ মাসে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন হলো?

“মব আর সেল্ফ-সেন্সরশিপে” এখনো বাকরুদ্ধ

আওয়ামী লীগ সরকারের কট্টর সমালোচকদের অনেক অভিযোগের মধ্যে একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে ওই সরকারের সময় দেশে নাকি গণমাধ্যমের কোন স্বাধীনতা ছিলো না এবং মুক্ত সাংবাদিকতার চর্চা নানাভাবে রুদ্ধ করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল।

তাদের আরো অভিযোগ ছিলো যে অনেক গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক সেই সময়ে সরকারের সমালোচনা না করে তোষামোদি করে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলো। সেই কারণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর জেল-জুলুম, হামলা-মামলাসহ, চাকুরিচ্যুতি, গণমাধ্যম অফিস দখল, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের মতো যে নারকীয় ঘটনা ঘটেছিল সেই সমালোচকদেরকে তখন তেমন কোন প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা দেখায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নীরব থেকে তারা একে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছেন বলে অনেকের কাছে মনে হয়েছে।

কিন্তু আমরা যদি নির্মোহভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করি তাহলে কি দেখতে পাই। সেই সময়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরকারের কট্টর সমালোচক সাংবাদিক বা বা অন্য পেশার লোকজন বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এজন্য কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বা কাউকে হত্যা মামলায় জেলে যেতে হয়েছে এমন কোন ঘটনার কথা মনে পড়ে না। সংবাদপত্রগুলোও সেই সময়ে সরকারের এবং সরকারি দলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করে রিপোর্ট করেছে। কিন্তু সেই জন্য কোন সংবাদপত্র অফিসে আগুন দেয়া বা হামলার ঘটনা ঘটেনি। তবে একথা সত্য যে কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ অনেকে মামলা করেছেনা। কিন্তু সে জন্য তাদেরকে ইউনুস সরকারের সময় বা এখনকার মতো দিনের পর দিন জেলে থাকতে হয়নি বা কারো বিরুদ্ধে খুনের মামলা করা হয়নি । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা আদালতে গিয়ে তারা জামিন পেয়েছেন এবং বিনা বাঁধায় তারা তাদের পেশা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।

আর কতিপয় সাংবাদিকের তোষামদি, চাটুকারিতা বা প্রশংসা যে নামেই ডাকুন এটা সব সরকারের আমলে কম-বেশি বজায় ছিলো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর এই সংস্কৃতির কোন দৃশ্যমান পরিবর্তন তো হয়ইনি বরং আরো বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দেশের গণমাধ্যমের দিকে এখন তাকালে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে তোষামোদি বা চাটুকারিতা এখন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সাজ্জাদ হোসেন সবুজ

আমরা যদি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী ঘটনা পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা কি দেখতে পাই। আমার সাথে অনেকেই একমত হবেন যে দেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির পাশাপাশি গণমাধ্যম শিল্পে এমন অরাজকতা, নৈরাজ্য, অস্থিরতা, ভাঙচুর, হামলা-মামলা, অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকদের হুমকি, গ্রেপ্তার ও জেলে পাঠানো দেশবাসী কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। সেই ১৮ মাসে আওয়ামী লীগ বা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বলে পরিচিত সাংবাদিকদের জীবনে নেমে এসেছিল অমানিশার ঘোর অন্ধকার যা এখনো অব্যাহত আছে। মিথ্যা মামলায় বহু সাংবাদিক এখনো জেলে আটক রয়েছেন। অনেকের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে অসংখ্য সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। সরকারের মদতে বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র অফিস দখল করে বিএনপি বা জামাত-এনসিপি সমর্থক লোকজনদেরকে বসানো হয়েছে । ফলে শত শত পেশাদার সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েছেন এবং তাদের বেশিরভাগই এখন পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেক সাংবাদিক। আবার অনেকের বিদেশ যাত্রায় আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সাংবাদিক ইউনিয়নের অফিস ভাঙচুর ও তালা দেয়া হয়েছে। অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে অসংখ্য সাংবাদিকের। অন্যদিকে কোন কারণ ছাড়াই “ফ্যাসিস্টের দোসর” তকমা দিয়ে অনেকের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য পদ খারিজ করে দেয়া হয়েছে।

ইউনুস সরকারের আমলে গণমাধ্যমে এক চরম ভীতিকর অবস্থা বিরাজমান ছিলো যা অনেকেই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় বলে বর্ণনা করেছেন। ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি ষ্টার অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার না করলে এই ঘটনায় অনেকেরই জীবন যেতো এতে কোন সন্দেহ নেই। ওই সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা তাদের সমর্থকদের হুমকি ও হস্তক্ষেপের কারণে সাংবাদিকেরা প্রকৃত ঘটনা অনেক সময় চেপে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেক টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র চাপের মুখে বহু রিপোর্ট প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। শুধুমাত্র সরকারের সমালোচনা করার কারণে সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে গ্রেপ্তার করে অনেক দিন জেলে আটক রাখা হয়েছিল।

ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. ইউনূস বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যম ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। “”আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি, আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মিডিয়া যাতে কোনো রকম বাধা বিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে সেজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। আরও যেসব কমিশন সরকারসহ অন্য সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে, আমরা তাদের পুনর্গঠন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি যাতে তারা আরও শক্তিশালী হয়, জনকল্যাণে কাজ করে”।

কিন্তু তার এই কথার সাথে যে কাজের কোনোরূপ মিল ছিলো না তা এদেশের মানুষ তার ১৮ মাসের সরকারের আমলে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পেয়েছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর বলেছেন, “ইউনূস একটা বিশ্ব বাটপার। ১৮ মাসে দেশকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন। দেশের প্রতিটি সেক্টর ধ্বংস করেছে। নিজে চুরি-চামারি করে নিজের সুবিধা নিয়েছে।” সম্প্রতি ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। এদিন দুর্নীতির মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে আসেন আনিস আলমগীর।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের সাংবাদিকদের কাজ হচ্ছে, যখন যে সরকার আসবে তার ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করা। আমি সেটাই করেছি। ইউনূসের আমলে সমালোচনা করতে গিয়ে আমাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।”

অনেকের মনে আশা ছিলো যে ইউনুস সরকারের বিদায় এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যম শিল্পে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে এবং সাংবাদিকরা কোন প্রকার হামলা-মামলা এবং ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে তাদের পেশায় মনোনিবেশ করতে পারবেন। কিন্ত ইউনুস জমানার সেই ভয়ের সংস্কৃতি গণমাধ্যমে এখনো বিরাজমান রয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতে এখনো একপ্রকার সেল্ফ-সেন্সরশিপ বা মালিকের খবরদারি অব্যাহত আছে। ভয় বা হুমকির কারণে অনেক রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে না বা চেপে যাওয়া হচ্ছে। যেসব সাংবাদিক জেলে আটক রয়েছেন, তাদের এখনো জামিন হয়নি। একটি মামলায় জামিন হলে পরে আরেকটি মামলায় তাদেরকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। যেসকল সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দেয়া হয়েছে সেই মামলা প্রত্যাহারের ব্যাপারে কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। টিভি চ্যানেলগুলোর টক শো বা আলোচনা অনুষ্ঠানে এখনো দুই/তিনটি নির্দিষ্ট দলের সমর্থক সাংবাদিক বা অন্য পেশার মানুষের প্রাধান্য লক্ষণীয়।

সর্বশেষ যেটা দেখলাম ২০২৪ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হতাহতের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির সাথে একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে হাজির করতে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৭ মে এই আদেশ দেন। ১৪ মে তাঁদের এই ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা ইতিমধ্যে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। এছাড়া হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন প্রবীণ সাংবাদিক, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক শাহরিয়ার কবির, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও একাত্তর টিভির সিনিয়র সাংবাদিক শাকিল আহমেদ।

গত ৩ মে চীন যেতে বাধা দেয়া হয় ওভারসিজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ওকাব) সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠুকে। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি মিঠু বর্তমানে জার্মান নিউজ এজেন্সি ডিপিএ’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি।

মিঠু অভিযোগ করেন, তাকে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনও কারণ জানানো হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এই বিষয়ে কোনও তথ্য পাননি বলে জানিয়েছেন। প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় বিমানবন্দরের যাত্রী লাউঞ্জে অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তাকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয় এবং তিনি যাত্রা বাতিল করে ফিরে যান বলে জানান। তিনি দাবি করেন, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার চলাচলের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।

এদিকে ঢাকা পোস্টের সাবেক সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার অভিযোগ করেছেন, পাঠ্যপুস্তক ছাপা ও ব্যবসায়িক লেনদেনে অনিয়ম সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে হুমকি, ভয়ভীতি ও চাপের কারণে তিনি পরিবারসহ বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এই সাংবাদিক। সেখানে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কালকে কেন্দ্র করে একাধিক উদ্বেগজনক ঘটনার বর্ণনা দেন।

৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের প্রাক্কালে একটি অনলাইন পোর্টাল এর সম্পাদকীয়তে লিখেছে, এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য—“শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের রূপকার: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য মুক্ত গণমাধ্যম”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই টেকসই হতে পারে না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনটি উদযাপনের চেয়ে আত্মোপলব্ধি আর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হবে অবারিত। কিন্তু দেড় বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, ভয়ের সংস্কৃতি কেবল রূপ পরিবর্তন করেছে, নির্মূল হয়নি। আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যম একদিকে যেমন কালাকানুনের জালে বন্দি, অন্যদিকে “মব সেন্সরশিপ” বা গোষ্ঠীগত চাপের মুখে বাকরুদ্ধ।

পোর্টালটি মন্তব্য করেছে যে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর আইনি কাঠামো। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত Digital Security Act (DSA) বাতিল করে Cyber Security Act (CSA) প্রবর্তন করা হলেও, এর মূল চরিত্র রয়ে গেছে দমনমূলক। বিশেষ করে মানহানি বা রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার মতো অস্পষ্ট ধারার সুযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দণ্ডবিধিকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে ধরনের আইনি যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা নজিরবিহীন। পেশাদার সাংবাদিকদের নির্বিচারে হত্যা মামলার আসামি করা কিংবা ‘উস্কানিদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত করা কেবল বিচারিক হয়রানি নয়, বরং একটি পুরো পেশাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা। যখন একজন সাংবাদিককে সংবাদ পরিবেশনের দায়ে খুনের মামলার আসামি হতে হয়, তখন সেখানে আইনের শাসনের চেয়ে প্রতিহিংসার প্রতিফলনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সদ্য গঠিত “নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের” সদস্য সচিব শেখ জামালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

শেখ জামাল, যিনি নিজেও ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন, তিনি তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন ২০২৪ সালের আগস্টে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ইউনূস ক্ষমতা দখল করেই বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মুক্তমনাদের ওপর আঘাত হানে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, মাজার, পীর ফকির আউলিয়ার সমাধী থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ রাস্ট্রীয় নীতির অংশ করে নেয় ইউনূসগংরা। রাস্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকদের ওপর চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার অংশ হিসেবে শত শত সাংবাদিককে আইনি হয়রানি, শারীরিক হামলা, মামলা, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডই শুধু বাতিল করা হয়নি, হাজারেরও বেশি সাংবাদিকদের চাকরীচ্যুতি করা হয়েছে। এছাড়াও সাংবাদিক হত্যায়ও মদদ দিয়েছে তারা। বিভিন্ন সময় এদেশের সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হলেও ইউনূসের আমলে নির্যাতনের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি মব সহিংসতাকেও উস্কে দিয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র অফিসে আগুন দিয়ে সাংবাদিকদের হত্যার চেষ্টা করেছে —এসব ঘটনা ইউনূস দায়মুক্তি দিয়ে ন্যক্কারজনক উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।

ইউনূসের ১৮ মাসের সরকারের সময়ে সাংবাদিক নির্যাতনের খন্ডচিত্র

গ্রেপ্তার-৪৭: শাহরিয়ার কবীর, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা, শেখ জামাল, মঞ্জুরুল আলম পান্না, আনিস আলমগীরসহ সারাদেশে ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েকজন এখনো কারাগারে।

সাংবাদিক হত্যা-১৩: মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক, সোহেল আখঞ্জিসহ ১৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়।

মামলা-৪৩৯: জাতীয় দৈনিক ও টিভি চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সারাদেশে ৪৪৯ জন সাংবাদিকের নামে হত্যা মামলা দেয়া হয়। যা এখনো বহাল আছে।

চাকরিচ্যুতি-১২০০: জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও টেলিভিশনগুলোর বার্তা প্রধান ও সাংবাদিকসহ সারাদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদদাতাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় পদ দখল করা হয়েছে।

ভাংচুর ও আগুন: বিটিভি, একাত্তর টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি, গান বাংলা, এটিএন নিউজ, এটিএন বাংলা, মাইটিভি, বিজয় টিভি, নিউজ২৪ ও আমাদের অর্থনীতি, আমাদের নতুন সময়, দৈনিক মুখপাত্র, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান, বাংলা নিউজ, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিস ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল- ১৬৮: নজীরবিহীনভাবে সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের ৭০০ জন সদস্যের পদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। যা এখনো বহাল আছে।

৫৪ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা: অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের দেশত্যাগে বেআইনি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যা এখনো বলবৎ আছে। ৪৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব বেআইনিভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। যা এখনো বলবৎ আছে।

তিনি লিখেছেন ইউনূসের আমলে যে নিপীড়ন চলেছে এবং ভবিষ্যতে যেন আর কেউ এমন নির্যাতন নিপীড়ন করতে না পারে সেই লক্ষে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ ‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’ গড়ে তুলেছে। শেখ জামাল বলেন ইউনূস যে দমন-নিপীড়নের ধারা তৈরি করে দিয়ে গেছে তা ভেঙে নতুন পথ তৈরি করতে না পারলে নতুন করে একই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে সাংবাদিক সমাজ আশঙ্কা করছে। আমরা বর্তমান সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই—স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, বরং একটি মৌলিক অধিকার।

‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’-এর ৯ দফা দাবি

১। দেশের সকল সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ২। কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে। ৩। সাংবাদিক হত্যার বিচার করতে হবে। ৪। চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের চাকরি ফেরত দিতে হবে। ৫। ডিইউজে ও বিএফইউজে অফিস খুলে দিতে হবে। অফিসের টাকাসহ মালামাল লুট করে আগুন দেওয়ার ঘটনার বিচার করতে হবে। ৬। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ সারাদেশের প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সদস্যপদ ফেরত দিতে হবে। ৭। সাংবাদিকের এ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৮। সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৯। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ অবনতি বাংলাদেশের

গত ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের সূচক অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে এবং গত বছরের চেয়ে পিছিয়েছে তিন ধাপ। এ বছর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। (সূত্র: বিবিসি)।

আরএসএফএর তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের ইতিহাসে প্রথমবারের মত অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর এর আগে কখনো এত নিচে নামেনি।

আরএসএফ প্রতিবছর একটি সূচক প্রকাশ করে যেখানে দেখার চেষ্টা করা হয়, সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং নিরাপত্তা– এই পাঁচটি দিক থেকে প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বাস্তব পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জটিলতা উঠে আসে বলে আরএসএফ দাবি করে।

প্রতিটি সূচকের জন্য শূন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি সহায়ক স্কোর গণনা করা হয়। যেসব দেশ ৮৫ থেকে ১০০ পয়েন্ট পায় তারা ‘ভালো’ (সবুজ); ৭০ থেকে ৮৫ পয়েন্ট ‘সন্তোষজনক’ (হলুদ); ৫৫ থেকে ৭০ পয়েন্ট ‘সমস্যাযুক্ত’ (হালকা কমলা); ৪০ থেকে ৫৫ পয়েন্ট ‘কঠিন’ (গাঢ় কমলা) এবং শূন্য থেকে ৪০ পয়েন্ট যারা যায় তাদের ‘খুব গুরুতর’ (গাঢ় লাল) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এবছর বাংলাদেশের স্কোর দেখানো হয়েছে ৩৩ দশমিক শূন্য পাঁচ। গতবছর যা ছিল ৩৩ দশমিক ৭১। যেসব দেশের পয়েন্ট বেশি সেগুলো তালিকার শুরুতে এবং যেসব দেশের পয়েন্ট কম, অর্থাৎ সাংবাদিকরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন সেসব দেশ তালিকার নিচের দিকে থাকে।

এবছর তালিকার ১ নম্বর অবস্থনে রয়েছে নরওয়ে এবং ১৮০টি নম্বরে আছে ইরিত্রিয়া। নরওয়ের স্কোর ৯২ দশমিক ৭২ এবং ইরিত্রিয়ার ১০ দশমিক ২৪। তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ৩১ দশমিক ৯৬ স্কোর নিয়ে ১৫৭ তম স্থানে এবং পাকিস্তান ৩২ দশমিক ৬১ স্কোর নিয়ে ১৫৩ তম স্থানে রয়েছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা নিয়েও বিশ্লেষণ রয়েছে।

সেখানে বলা আছে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে এক পঞ্চমাংশেরও বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং তাদের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার খুব সীমিত। দেশটিতে খবর ও তথ্যের প্রচারে ইন্টারনেটের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। গণমাধ্যমের চিত্র আরএসএফ বলছে, রাষ্ট্রীয় দুটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যম, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) কার্যক্রমে কোনো সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নেই; এগুলো কার্যত সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

তারা জানিয়েছে, বেসরকারি খাতের গণমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে প্রায় তিন হাজার মুদ্রিত গণমাধ্যম, দৈনিক ও সাময়িকী, ৩০টি রেডিও স্টেশন- যার মধ্যে কিছু কমিউনিটি রেডিও আছে। ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল এবং কয়েক শ’ সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটও আছে। “জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভি, সময় টিভি ও একাত্তর টিভি আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল”, তবে তারা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত ছিল বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।

দেশের দুটি শীর্ষ দৈনিক—বাংলাভাষার প্রথম আলো ও ইংরেজি ভাষার ডেইলি স্টার—কিছুটা হলেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে সরকারগুলো গণমাধ্যমকে মূলত যোগাযোগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়। তারা বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না যেখানে সেন্সরশিপ, অনলাইন হয়রানি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানি, একাধিক কঠোর আইন, পুলিশি সহিংসতা এবং ক্ষমতাসীন দলের মিলিশিয়াদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। “শেখ হাসিনার সরকার সাংবাদিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা অবিরাম বাড়িয়ে তোলে। এসব বাস্তবতায় সংবাদকক্ষগুলো সরকারকে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপে আশ্রয় নেয়”।

আইনি কাঠামো

বাংলাদেশে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাস হওয়া সাইবার সিকিউরিটি আইনকে (সিএসএ) বিশ্বের অন্যতম কঠোর সাংবাদিক-বিরোধী আই নএবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের (ডিএসএ) একটি দুর্বল সংস্করণ বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে শেখ হাসিনার সরকারের আনা এই আইনের অধীনে ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতার; ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ; ইচ্ছামতো অজুহাতে সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অনুমোদন দেওয়া হয়। আরএসএফের ভাষ্য- “এমন পরিবেশে সংবাদকক্ষের সম্পাদকরা নিয়মিতভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপে বাধ্য হয়েছেন”।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

বেসরকারি মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ গণমাধ্যমের মালিকানা রয়েছে অল্প কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর হাতে, যারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় উঠে এসেছেন। তারা গণমাধ্যমকে প্রভাব বিস্তার ও মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন এবং সে কারণে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেন। এছাড়া অনেক সংবাদপত্র এখনো সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া অর্থ এবং আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর নির্ভরশীল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সংবিধানে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আরএসএফ বলছে, এই ‘দ্বিধা’ গণমাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়, যেখানে ধর্মসংক্রান্ত বিষয় প্রায় নিষিদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত এবং “মূলধারার গণমাধ্যমে বাংলাদেশে বসবাসকারী এক কোটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুর প্রসঙ্গ প্রায় কখনোই আলোচিত হয় না”। গত এক দশকে “বাংলাদেশে উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলো ভয়াবহ সহিংস অভিযান চালিয়েছে, যার ফলে সাংবাদিক হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এখন এসব গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ধর্মনিরপেক্ষতা, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা সাংবাদিকদের শনাক্ত ও হয়রানি করছে”- বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

নিরাপত্তা

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সাংবাদিক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রায়ই ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের সময় ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলাও করা হয়। বিশেষ করে ‘হত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে এদের মধ্যে পাঁচজন আটক হন।

এছাড়া সাংবাদিকতা “পেশাটি এখনো মূলত পুরুষশাসিত, আর নারী সাংবাদিকরা গভীরভাবে শেকড় গেঁড়ে থাকা হয়রানির সংস্কৃতির মুখোমুখি হন এবং নিজেদের অধিকার প্রকাশ্যে রক্ষার চেষ্টা করলে অনলাইন বিদ্বেষমূলক অভিযানের শিকার হন”- বলা হয়েছে আরএসএফের প্রতিবেদনে।

লেখক: সাজ্জাদ হোসেন সবুজ—সিনিয়র সাংবাদিক এবং ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক প্রেস মিনিস্টার।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles