দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব, চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু এবং টিকাদান ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটে অভিযোগ করা হয়েছে, আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হামের টিকাদান কর্মসূচিকে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ছিল ‘অশুভ, অপরাধমূলক ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক’। এর ফলে দেশে হামের ভয়াবহ পুনরুত্থান ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রিটে বলা হয়, এই সিদ্ধান্তের কারণে টিকাদান কাভারেজ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার ফলেই দেশজুড়ে নতুন করে ব্যাপক হামের সংক্রমণ দেখা দেয়। এতে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং অসংখ্য শিশু ও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তদন্ত কমিটি ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার দাবি
রিট আবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন জানানো হয়েছে।
রিটে বিবাদী করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের।
যাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান, নূরজাহান বেগম, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ আরও অনেকে।
ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ আবারও ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বহু শিশু ও সাধারণ মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রীয় টিকাদান ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমরা মনে করি, এই অশুভ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া জরুরি।”
আগেই পাঠানো হয়েছিল লিগ্যাল নোটিশ
এর আগে গত ৬ এপ্রিল একই ইস্যুতে সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান ব্যারিস্টার আশরাফুল ইসলাম। ওই নোটিশে পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন এবং ড. ইউনূসসহ সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
নোটিশে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রোববার দায়ের করা রিটটি সেই ঘোষণারই ধারাবাহিকতা বলে জানিয়েছেন তিনি।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ
হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়মিত ও কার্যকর টিকাদান কর্মসূচিই হামের বিস্তার রোধের প্রধান উপায়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় শিশুদের নিয়মিত হাম টিকা দেওয়া হয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত এই কর্মসূচি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত ছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান ব্যবস্থায় সামান্য দুর্বলতাও দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে প্রশাসনিক অস্থিরতা, কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সেবাব্যবস্থার বিঘ্ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সেনা-সমর্থিত ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীঘনিষ্ঠ অন্তর্বর্তী প্রশাসন। সেই সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় খাতে নীতিগত পরিবর্তন, পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অনেক সিদ্ধান্ত যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল, যার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও জনসেবাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে।
পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হামের টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে দায়ের হওয়া এই রিট শুধু স্বাস্থ্যখাতের প্রশ্ন নয়; এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
এখন কী হতে পারে
আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানিতে রুল জারি করবেন কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদালত চাইলে তদন্ত কমিটি গঠন, নথিপত্র তলব বা সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী নির্দেশনাও দিতে পারেন।
তবে রিটে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখনো ড. ইউনূস বা অন্য কারও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত হাইকোর্টে রিটটির শুনানির দিন নির্ধারণ হয়নি।

