সংগঠন নিষিদ্ধে কঠোর আইন পাস, বহাল থাকছে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে গণতন্ত্র ধ্বংশ ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের প্রক্রিয়ায় জনমনে উদ্বেগ

বিএনপি-জামায়াত নিয়ন্ত্রিত জাতীয় সংসদ গতকাল সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে যে কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার অসীম ক্ষমতা করায়ত্ত করেছে। এই আইনের মাধ্যমে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি দেওয়া হলো।

শুধু সংগঠন নিষিদ্ধ নয়, সেই সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং শাস্তি প্রদানের সুযোগও তৈরি করা হয়েছে এই সংশোধনীর মাধ্যমে। ফলে শুধু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নয়, দেশের গণতন্ত্রকেও একরকম নিষেধাজ্ঞার কবলে ফেলে ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বিলটি উত্থাপন করে অবিলম্বে পাসের প্রস্তাব দেন, যা কোনো দফাওয়ারি আলোচনা ছাড়াই গৃহীত হয়।

বিল উপস্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯-এর অধিকতর সংশোধনের লক্ষ্যে এই বিলটি আনা হয়েছে।” পরে তিনি এটিকে “একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে।

নতুন আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ও ২০ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সরকার কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে শুধু নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেই পারবে না, বরং তাদের সব ধরনের কার্যক্রমও বন্ধ করে দিতে পারবে। এর আওতায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনের আর্থিক লেনদেন, সম্পদ, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, এমনকি অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতিও বন্ধ করা যাবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের আইনে সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় এই সংশোধন আনা জরুরি ছিল। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি অধ্যাদেশ জারি করে একই ধরনের বিধান কার্যকর করা হয়েছিল। নতুন এই আইনের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশই স্থায়ী রূপ পেল।

এই আইনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সংবেদনশীল। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়াই বিএনপি ক্ষমতায় আসে, যা সমালোচকদের মতে একতরফা নির্বাচন ছিল।

অন্যদিকে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সংসদেই পাস হওয়া এই আইন আওয়ামী লীগকে আরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, এই পরিবর্তনের পেছনে সেনাবাহিনীর একটি অংশ এবং ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থন ছিল।

এর পর থেকেই দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে অন্তত ৩১৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবে, পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর দুই হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট পারভেজ হাশেম বলেন, “এই আইন গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে এবং এক ধরনের নব্য-ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করবে, যা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপরীতে ইসলামপন্থী রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।”

সংসদে বিলটি পাসের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, তারা বিলের তুলনামূলক বিবরণী হাতে পেয়েছেন মাত্র কয়েক মিনিট আগে। তিনি আইনটি পাসের আগে আরও সময় দেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে স্পিকার তা নাকচ করে বলেন, “আপত্তি জানানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় ছিল। এই পর্যায়ে এসে আর আপত্তি করার সুযোগ নেই।”

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংশোধনের ফলে শুধু রাজনৈতিক কার্যক্রম নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক আইন বিশ্লেষক বলেন, “যখন কোনো সংগঠনের বক্তব্য, সমাবেশ বা অনলাইন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়, তখন তা সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে।”

এই আইন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। একসময় আওয়ামী লীগ সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছিল, যেখানে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের দণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই একই আইনি কাঠামো এখন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা হচ্ছে—যা মু্ক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাংলাদেশের চেতনার সাথে পরিহাস মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দলটিকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি সন্ত্রাস দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই আইনের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরও মেরুকৃত হয়ে উঠবে এবং দেশটি ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে আরও সীমাবদ্ধ ও মতাদর্শিকভাবে বিভক্ত একটি ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles