তেহরান / ওয়াশিংটন, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ — ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নজিরবিহীন সহিংসতার অভিযোগের মধ্যে দেশটির পরিস্থিতি দ্রুত আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে বিক্ষোভ দমনে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও গোপন অভিযানের একাধিক সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং ইরানের সামরিক ও যোগাযোগ কাঠামো অকার্যকর করার পরিকল্পনা।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও আলোচনার ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ইরানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং আলোচনার আগ্রহ দেখানো হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আলোচনার আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
তিনি বলেন, “ওরা আলোচনায় বসতে চায়। কিন্তু বৈঠকের আগেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।”
ট্রাম্প আরও জানান, যদি আরও বিক্ষোভকারী নিহত হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র “খুব শক্তিশালী বিকল্প” প্রয়োগে পিছপা হবে না।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি, তথ্য সংগ্রহে বড় বাধা
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) বলছে, ১০ হাজার ৭০০–এর বেশি মানুষ আটক হয়েছেন।
তবে রয়টার্সকে দেওয়া এক ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। ইরানের বাইরে অবস্থানরত বিরোধী গোষ্ঠী ও দেশটির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
তথ্য যাচাইয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের আরোপ করা ইন্টারনেট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। গত কয়েক দিন ধরে ইরান কার্যত বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। যদিও সীমিতভাবে বিদেশে ফোন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, ইন্টারনেট এখনো প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ।
হাসপাতালগুলোতে ভয়াবহ চাপ
বিক্ষোভ দমনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর তাজা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেক জায়গায় সরাসরি বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
“নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালায়। মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই পড়ে যাচ্ছিল।”
চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, বহু শহরের হাসপাতাল মৃত ও আহতদের চাপ সামলাতে পারছে না।
সরকারের কঠোর অবস্থান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে “প্রতারণা” ও “বিদেশি ষড়যন্ত্রের” অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি সরকার-সমর্থিত সমাবেশের প্রশংসা করেন এবং বলেন,
“ইরানি জাতি শক্তিশালী, সচেতন এবং তার শত্রুদের চেনে।”
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান আলোচনার পথ খোলা রাখছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।
তিনি বলেন,
“আমাদের প্রস্তুতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আমি আশা করি, বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে।”
অর্থনৈতিক সংকট থেকেই বিস্ফোরণ
এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল ইরানের জাতীয় মুদ্রার ভয়াবহ পতন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যপণ্যের দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে। খাদ্যপণ্য ইরানের মোট আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে।
সরকারি সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাওয়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সেই দাবির সঙ্গে মিলছে না।
ইউরোপ ও জাতিসংঘের তীব্র প্রতিক্রিয়া
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্ৎস বলেন, “যে সরকার কেবল সহিংসতার মাধ্যমে টিকে থাকতে চায়, সেটি কার্যত তার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে হবে। দ্রুত বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা শোনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
সংকটের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও এখনো ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে বড় ধরনের ভাঙনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সরকার একদিকে অর্থনৈতিক ক্ষোভকে স্বীকার করছে, অন্যদিকে চালাচ্ছে কঠোর দমননীতি।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা জানতে আরও সময় লাগতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের এই সংকট আর শুধু অভ্যন্তরীণ নয়। এটি এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে, যার পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর।

