মব সন্ত্রাসের কবলে অর্থনীতি; বিনিয়োগ এখন ইতিহাসের সর্বনিম্নে

বিনিয়োগ ধস, উন্নয়ন ব্যয় স্থবির, আস্থার সংকট বাড়ছে; রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ঋণের চাপে বাংলাদেশ অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে বলে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের অর্থনীতি গভীর চাপে পড়েছে। বিনিয়োগ নেমে এসেছে এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সরকারি উন্নয়ন ব্যয় মারাত্মকভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে—এমনটাই বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।

তাঁদের মতে, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক দমননীতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘স্থিতিশীলতার’ কথা বললেও বাস্তবে অর্থনীতি নতুন প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে না। বরং আগের সময়ের অবকাঠামো ও সঞ্চয়ের ওপর ভর করেই চলমান আছে।

ভারতের সাথে বাণিজ্য নিয়ে কৌশলগত ব্যর্থতা ও ভারত বিদ্বেষী রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর সীমান্ত বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে এবং আমদানি ও রপ্তানি খাতকে বিপন্ন করেছে। আমদানির তুলনায় রপ্তানির অপর্যাপ্ততা প্রবল হয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে ধস

অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন ব্যয়ে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ১৭.৩ শতাংশ। এটি গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) জানায়, সংশোধিত বরাদ্দের বিপরীতে পুরো অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৭.৮৫ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দুর্বল পারফরম্যান্স।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি সতর্ক করে বলেছে, উন্নয়ন ব্যয় দীর্ঘদিন কম থাকলে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়, অবকাঠামো প্রকল্প আটকে পড়ে এবং বেসরকারি খাতের আস্থা আরও দুর্বল হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ই অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। সরকার যখন সড়ক, বিদ্যুৎ, স্কুল, হাসপাতাল বা যোগাযোগ খাতে ব্যয় কমায়, তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও কমে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অর্থনীতি অনেকটাই আগের সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামো ও আর্থিক সঞ্চয়ের ওপর টিকে আছে। নতুন বড় উদ্যোগ বা বিনিয়োগ তেমন দেখা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগে ভাটা

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের চাপ, ডলারের সংকট, এলসি খুলতে জটিলতা এবং গ্যাস–বিদ্যুতের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা।

মব সহিংসতা এখন বড় উদ্বেগ। বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। আন্তর্জাতিক জুতা ব্র্যান্ড ‘বাটা’র শোরুমগুলোতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার পর সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ গত ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে ‘মব সন্ত্রাসে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সভা আয়োজন করেছিল। সভায় পরিস্থিতি নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগের কথা জানান ব্যবসায়ী নেতারা।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে অন্তত ২৩৭ জন মব হামলা ও রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, একটি কানাডাভিত্তিক সংস্থার সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত দেশে মব লিঞ্চিংয়ে নিহত হয়েছেন ৬৩৭ জন। সময়কাল ভিন্ন হলেও সহিংসতার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এ ছাড়া কখনো ভারতীয় পণ্য, কখনো ইসরায়েলি বা ফরাসি পণ্যের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকির বার্তা হিসেবে ধরা পড়ছে।

ব্যবসায়ী সংগঠন ও আইন বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু শিল্পপতি ও অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকে আত্মগোপনে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে কারখানা উৎপাদন কমেছে, দোকানপাট বন্ধ হয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুর্বল হয়েছে।

বিনিয়োগ সম্মেলন, বাস্তব বিনিয়োগ নেই

অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগ সম্মেলনের কথা বলছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব বিনিয়োগের মিল নেই।

তাঁদের মতে, জমি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, চুক্তির আইনি নিশ্চয়তা এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের গ্যারান্টি না থাকলে বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয় না।

২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এক অবস্থানপত্রে জানায়, নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাচ্ছে। এমসিসিআই বলেছে, “ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, ব্যাংক খাতের চাপ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।”

ঋণের চাপ ও মূল্যস্ফীতি

ম্যাক্রো অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৪.৪৯ বিলিয়ন ডলারে। ঋণ পরিশোধে রপ্তানি আয় ও রাজস্বের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

একই উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও দেশে উল্টো চিত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায়, চালই খাদ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় কারণ।

আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিক সাবিহা আখতার ভয়েসকে বলেন, “চালের দাম বাড়লে সবকিছু ভেঙে পড়ে। ভাড়া, যাতায়াত, স্কুলের খরচ—কিছুই কমে না।”

কুষ্টিয়ার চালের পাইকার আবদুল হান্নান ভয়েসকে বলেন, “খরচ বাড়ছে, কিন্তু বিক্রি কমছে।”
মিরপুরের দোকানি তুহিন হোসেন ভয়েসকে বলেন, “মানুষ এখন অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে।”
গাজীপুরের পোশাক কারখানা মালিক মোমিনুল হোসেন মৃধা বলেন, “বর্তমান অর্ডারেই টিকে আছি। নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবছি না।”

আস্থার সংকট

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ এখনো মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়েনি। তবে বিনিয়োগ স্থবিরতা, ঋণের চাপ ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আগস্ট ২০২৪-এর পর প্রশাসনিক রদবদল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার নিয়ে অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ ফেরাতে সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বর্তমানে অর্থনীতি আগের দশকে গড়ে ওঠা ভিত্তির ওপর চলছে। এই ভিত্তির ওপর নতুন গতি আসবে কি না, তা নির্ভর করছে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ওপর। না হলে বর্তমান সংকটই ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

spot_img