গত ৯ জানুয়ারি ২০২৬ এর দৈনিক সমকাল পত্রিকায়, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টার সাম্পতিক ফেসবুক পোস্ট উদ্ধৃত করে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যেখানে আইন উপদেষ্টাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়— আইন মন্ত্রণালয় দায়মুক্তি অধ্যাদেশের একটি খসড়াও তৈরি করেছে, আগামী উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।” একই পোস্টের বরাতে সংবাদের আরও উল্লেখ করা হয়— “বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে এবং ১৯৭৩ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইন হয়েছিলো।”
কিন্তু দায়মুক্তি অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের দায়মুক্তির সাথে মিলিয়ে সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা কতটা যথাযথ, সে বিষয়ে আলোচনার দাবি রাখে। দায়মুক্তির ক্ষেত্রে সংবিধানের প্রথম ভাগে বর্ণিত সংবিধানের প্রাধাণ্য সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ৭ এবং তৃতীয়ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ২৬, ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫সহ সংসদ এবং উচ্চ আদালতের রায়ের নজিরের আলোকে ৪৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ে উদ্ধৃত ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ।যদিও প্রশ্ন করবার সুযোগ থেকেই যায় যে, একজন সংবিধান বিশ্লেষক ও অধ্যায়নকারী হিসেবে আইন উপদেষ্টার বক্তব্য কি যথার্থ নয়? কিংবা এর ঠিক উল্টো প্রশ্ন— আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি কি এমন তুলনামূলক ব্যাখ্যার অবতারণা করতে পারেন?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান এর ৪৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— “এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানাবলীতে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা-রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন কিংবা ঐ অঞ্চলে প্রদত্ত কোন দণ্ডাদেশ, দণ্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোন কার্যকে বৈধ করিয়া লইতে পারিবেন।” অনুচ্ছেদটি বিশ্লেষণ করতে হলে, এর সাথে ইতোপূর্বে উল্রেখ্য অনুচ্ছেদগুলো অবশ্যপাঠ্য। সেদিকে যাওয়ার আগে, যদি ৪৬ অনুচ্ছেদটিই পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যায়, এখানে দুটি অংশ রয়েছে, যার একটি— “জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে” এবং অপর অংশটি হলো— “বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা-রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে”— এই অংশদুটির সাথে প্রস্তাবিত দায়মুক্তি সম্পর্কিত অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক আদৌ আছে কি? যার খুব সাধাসিধে ও প্রণিধানযোগ্য উত্তর হলো “না”।
এবার যদি ৪৬ অনুচ্ছেদ আলোচনার ক্ষেত্রে এর সাথে একত্রে অবশ্যপাঠ্য অনুচ্ছেদগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, প্রথম ভাগের অনুচ্ছেদ ৭ এর উপ-অনুচ্ছেদ-১ এ বলা হয়েছে, সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে এবং উপ-অনুচ্ছেদ-২ এ বলা হয়েছে, সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সাথে অসমঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে। অর্থাৎ জনগণের দ্বারা ক্ষমতায়িত হয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উল্লেখেই সমাধান নয়, বরং ক্ষমতাটি সংবিধানের অধীন প্রয়োগ করতে হবে। আবার সংবিধানের সাথে অসমঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিলযোগ্য বলা হয়েছে।
তৃতীয় ভাগের অনুচ্ছেদ ২৬ এ বলা হয়েছে, সংবিধান প্রবর্তনের পর মৌলিক অধিকারের সাথে অসমঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হবে। অর্থাৎ সংবিধান প্রবর্তনের পর প্রচলিত আইনের যে অংশ মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তা বাতিল। একইভাবে নতুন কোনো আইনের প্রচলন করা হলে, তারও অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ বাতিলযোগ্য; অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার ঘোষণা করেছে, যা এক কথায় বৈষম্যহীনতা।ব্যক্তি, পদমর্যাদার কারণে ভিন্ন অবস্থানের হয়ে থাকলেও বৈষম্যহীনভাবে সকলেই সমান। এমনকি কারো উপর অপরাধকার্য সংঘটিত হলে, কিংবা কেউ অন্যায্যতার শিকার হলে, আইনের আশ্রয়লাভে কারো দ্বারা বৈষম্যের শিকার হবেন না। অনুচ্ছেদ ৩১ এ— আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভের অবিচ্ছেদ্য অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এখানেও বৈষম্যহীনভাবে এবং আইনানুযায়ী বিবেচিত হওয়ার অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির রয়েছে, যা থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এর বাইরেও আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে বঞ্চিত না করার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩২), ফৌজদারী অপরাধের দায়ে আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার এবং কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)(৪), আলোচ্য ৪৬ অনুচ্ছেদ পাঠের সময় অবশ্যপাঠ্য।
ফলে অনুচ্ছেদ ৪৬ দায়মুক্তি আইনের বৈধতা দিয়েছে, এ ধরনের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপেই সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং একটি লজিক্যাল ফ্যালাসি বা কুযুক্তি। আপাত ক্ষেত্রে এ ধরনের যুক্তি শুনতে সঠিক মনে হলেও প্রকৃত অর্থে তা ভুল ও বিভ্রান্তিকর। যদিও রাষ্ট্র এ ধরনের কুযুক্তির উপর ভর মানুষের মধ্যে বিশ্বাসও সৃষ্টি করা যায় বলে, রাষ্ট খুব সহজেই তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে। রাষ্ট্রের এই প্রবণতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কূট কৌশল বললেও খুব বেশি বলা হয় না।
৪৬ অনুচ্ছেদ বিষয়ক আলোচনার আরও কিছু নজির বাংলাদেশে আছে।সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনায় জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, যা পরবর্তীতে সংসদে আত্মিকৃত করা হয়েছিলো। এই আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ৭৫ সালের খুনিদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ইমডেমনি অধ্যাদেশ জারিকালেও এমন কুযুক্তিতে ৪৬ অনুচ্ছেদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো, যদিও তা ধোপে টেকেনি।
এ ছাড়াও র্যাব র্প্রতিষ্ঠার পর কথিত যৌথ বাহিনীর বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইমডেমনিটি প্রদানে তৎকালীন সরকার “যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩” পাশ করে। পরবর্তীতে আইনটি চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন দায়ের করা হলে, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী (যতদূর জানি, বর্তমান গুম কমিশনের সভাপতি) এবং মাননীয় বিচারপতি মোঃ আশরাফুল কামাল এর সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ, আইনটি বাতিল করে রায় প্রদান করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে ৪৬ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলা হয়, সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির যে বিধান আছে, সেটা মুক্তিযুদ্ধকালীন (১ মার্চ, ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, ৭১) পরিস্থিতির জন্যই প্রযোজ্য ছিল। সে কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম (দায়মুক্তি) আদেশ, ১৯৭৩ জারি করা হয়েছিল।কিন্তু সেই যুক্তি এ ক্ষেত্রে অচল। রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, হত্যা ও নির্যাতন থেকে দায়মুক্তি দেওয়া যেকোনো ধরনের সরকারি আদেশ, আইন বা বিধিমালা তৈরি করা হবে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(৩), ৩৫(৫) এবং ৪০ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।কাজেই জুলাই প্রেক্ষাপটে দায়মুক্তির দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা অপ্রণিধানযোগ্য। উচ্চ আদালতের বিদ্যমান নজিরকে পাশকাটিয়ে এ ধরনের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করা আইনের শাসনের পরিপন্থী, যা এক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
মনে রাখতে হবে, দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারির উদ্দেশ্যে সাংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের অপব্যাখ্যা করে যে, কুযুক্তি উৎপাদন করা হচ্ছে, তা আর যাই হোক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ নয়। আপাতদৃষ্টিতে কুযক্তি হীন উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক হলেও বিচারহীনতাই বেগবান হয়।
লেখক: জীবনানন্দ চন্দ, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

