ইরানে ৫৪৪ নিহত, যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারিতে পরিস্থিতি আরও জটিল

অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে হাজারো গ্রেপ্তার; তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে বললেও সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন

তেহরান, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ — ইরানে চলমান সহিংস দমন-পীড়নের মধ্যে দেশটির পরিস্থিতি আজ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এমন এক সময়ে এই উত্তেজনা বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে—তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে, তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ও অমানবিক শক্তি প্রয়োগে কমপক্ষে ৫৪৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ আটক হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Activists News Agency (HRANA) জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই সাধারণ নাগরিক—যাদের মধ্যে শিক্ষার্থী, তরুণ শ্রমজীবী ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষ রয়েছেন। সংগঠনটির মতে, অনেককে রাস্তায় বিক্ষোভ চলাকালে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তারের পর হেফাজতে মারা গেছেন।

আহত হয়েছেন আরও কয়েক শত মানুষ। একাধিক শহরের হাসপাতাল আহতদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইরান সরকার এখনো কোনো সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এসব তথ্য প্রত্যাখ্যান করেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয় নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বেতন বকেয়া এবং জাতীয় মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন অর্থনৈতিক দাবির গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়।

বর্তমানে দেশটির সব ৩১টি প্রদেশেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, আবাসিক মহল্লা ও ঐতিহ্যবাহী বাজারকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত জমায়েত হচ্ছে। অনেক জায়গায় সন্ধ্যার পর বিক্ষোভ নতুন করে জোরালো হচ্ছে।

কড়া নিরাপত্তা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে। দাঙ্গা পুলিশ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী তাজা গুলি, ধাতব পেলেট, কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করছে এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে।

এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে সরকার প্রায় পুরো দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বহু পরিবার জানতেই পারছে না—গ্রেপ্তার হওয়া স্বজন কোথায় আছেন বা কী অবস্থায় রয়েছেন।

সরকার দায় অস্বীকার, বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

আজ তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগাছি দাবি করেন, এই বিক্ষোভ আসলে দেশের ভেতরের অসন্তোষ নয়, বরং বিদেশি শক্তির উসকানিতে সৃষ্ট একটি নিরাপত্তা সংকট।

তিনি বলেন, “এই তথাকথিত বিক্ষোভ ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংস করা হয়েছে, যাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করা যায়।”

আরাঘচি আরও দাবি করেন, পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের ফারাক রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি, উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রূপ নিচ্ছে

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন,
“আলোচনার আগেই পরিস্থিতির কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।”

এই বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক নেতারা পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিদেশি সামরিক হামলা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে।

অর্থনীতি স্থবির, জনজীবন বিপর্যস্ত

বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের প্রভাবে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বহু শহরে দোকানপাট বন্ধ, পরিবহন ব্যবস্থা বিঘ্নিত, শ্রমিক ধর্মঘট চলছে। সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং কঠোর দমননীতি মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বিস্ফোরণোন্মুখ।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ইরান এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও আন্তর্জাতিক চাপ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। বিক্ষোভ থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই, বরং হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

এই সংকট কোন পথে যাবে—সংলাপ, আরও সহিংসতা, না কি আন্তর্জাতিক সংঘাত—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles