ঢাকা — ডিসেম্বরের শেষ দিকের এক গভীর রাত। ঘুম ভেঙে ধোঁয়ার গন্ধ আর আগুনের শব্দে চমকে ওঠেন ৩০ বছর বয়সী মিতুন শীল। দক্ষিণ চট্টগ্রামে তার পরিবারের বসতঘর তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আতঙ্কের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, ঘরের দরজাগুলো বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। কোনো উপায় না দেখে মিতুন খালি হাতে টিনের দেয়াল ভেঙে একে একে স্ত্রী, দুই শিশু সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাইরে বের করে আনেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘরের ছাদ ধসে পড়ে। ভোর হলে দেখা যায়—ঘরবাড়ি আর জীবনের সঞ্চিত প্রায় সবকিছুই ছাই হয়ে গেছে।
পরদিন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে মিতুন শীল বলেন, “ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। আমাদের ঘর নয়, আমাদের জীবনটাই শেষ করে দিতে চেয়েছিল।”
মিতুনের পরিবারে হামলাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসীসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন, পুলিশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—এটি একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা।
দেশজুড়ে সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর বর্ণনায় একটি অভিন্ন চিত্র ফুটে উঠছে: রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ হামলা, ঘরের বাইরে থেকে তালা দেওয়া, দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন লাগানো, ধর্মীয় হুমকি—আর তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর সুরক্ষার অনুপস্থিতি।
সহিংসতার এক মাস
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ডিসেম্বর মাসেই সংঘবদ্ধ হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতায় অন্তত চারজন হিন্দু পুরুষ নিহত হয়েছেন। রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য হিন্দু পরিবারের বসতঘর। খ্রিস্টান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গির্জায় এসেছে বোমা হামলার হুমকি। বৌদ্ধ ও আদিবাসী নেতারাও বাড়তে থাকা ভয়ভীতির কথা জানিয়েছেন।
এই হামলাগুলোর অনেকগুলোই মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুক ও এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে—হামলার সময় উল্লাস, ধর্মীয় স্লোগান, এমনকি নিহতদের দাফন বা সৎকারে বাধা দেওয়ার দৃশ্যও। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব ভিডিও অপরাধীদের বিচারের মুখে আনার বদলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ ৪ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা এই দেশের নাগরিক, কিন্তু আমাদের জীবনকে মূল্যহীন মনে করা হচ্ছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এগুলো নিরবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস।”
খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, আপাতত সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হিন্দুরা হলেও অন্য সংখ্যালঘুরাও ক্রমেই ঝুঁকিতে পড়ছেন।
পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ধারাবাহিকতা
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১৮ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায়।
কারখানাশ্রমিক ২৭ বছর বয়সী হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে সহকর্মীরা ইসলাম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন—যা তার পরিবার সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একদল লোক দীপুকে কর্মস্থল থেকে টেনে বের করে, বেধড়ক মারধর করে অচেতন করে ফেলে, বিবস্ত্র করে রাস্তার পাশে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দীপুর দেহ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং আর লোকজন ”আল্লাহু আকবর” স্লোগান দিচ্ছে। কেউ বাধা দেয়নি।
এই ভিডিও পর্যালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী পারভেজ হাসেম বলেন, “এটি ছিল প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড। একটি বার্তা দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছে।”
দীপুর বাবা রবিলাল চন্দ্র দাস বলেন, হত্যার পরও স্থানীয় উগ্রবাদীরা ছেলের সৎকারে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। “ছেলেকে মারার পরও ওরা তার মর্যাদা কেড়ে নিতে চেয়েছে,” বলেন তিনি।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় অন্তত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যদিও নৃশংসতায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী অপরাধীর সংখ্যা শতাধিক।
এর ছয় দিন পর, ২৪ ডিসেম্বর, রাজবাড়ীর পাংশায় আমৃত মণ্ডল (২৯) নামে আরেক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করে, এটি চাঁদাবাজি ও অপরাধসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটেছে এবং একে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড বলা ঠিক নয়। তবে নিহতের পরিবার ও নাগরিক সমাজ এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।
২৬ ডিসেম্বর দেওয়া সরকারি বিবৃতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভ্রান্ত তথ্য’ ছড়ানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়। কিন্তু মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধারাবাহিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান সন্দেহজনক।
পারভেজ হাসেম বলেন, “যখন সংখ্যালঘুদের পিটিয়ে মারা হয় আর প্রথম প্রতিক্রিয়াই হয় অস্বীকার—তখন দায়মুক্তি আরও প্রকট হয়।”
২৯ ডিসেম্বর একই ভালুকা এলাকায় আনসার বাহিনীর সদস্য, ৪০ বছর বয়সী হিন্দু নাগরিক বজেন্দ্র বিশ্বাস গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশ প্রথমে ঘটনাটিকে ‘দুর্ঘটনাজনিত গুলি’ বলে উল্লেখ করলেও পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
বজেন্দ্রের ভাই সুজন বিশ্বাস বলেন, “তিনি প্রশিক্ষিত ছিলেন। এভাবে দুর্ঘটনাবশত গুলি ছোড়ে না। আমরা মনে করি এটি প্রতিশোধমূলক।”
শরীয়তপুরে জীবন্ত দগ্ধ
৩১ ডিসেম্বর রাতে শরীয়তপুরে অটোতে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন ৫০ বছর বয়সী হিন্দু দোকানি খোকন চন্দ্র দাস। পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাকে রাস্তার পাশে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করে, পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
জ্বলন্ত অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে খোকন পাশের পুকুরে ঝাঁপ দেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর তার মৃত্যু হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, “তিনি গুরুতর দগ্ধ হয়েছিলেন এবং একাধিক আঘাত ছিল।”
খোকনের স্ত্রী সীমা দাস বলেন, “আমাদের কোনো শত্রু ছিল না। ওকে মারা হয়েছে শুধু সে হিন্দু বলেই।”
ঘরবাড়িতে আগুন, তালাবদ্ধ মানুষ
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অন্তত সাতটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রাউজানে মিতুন শীলের বাড়ির বাইরে রাজনৈতিক নেতাদের নামসংবলিত একটি ব্যানার ঝুলিয়ে রাখা হয়। কাছাকাছি আরেকটি বাড়িতে একই ধরনের ব্যানার পাওয়া যায়।
স্থানীয়রা জানান, ব্যানারগুলোতে ‘ইসলামবিরোধী কার্যক্রম বন্ধের’ হুমকি ছিল।
এক স্থানীয় হিন্দু নেতা বলেন, “এটা পরিকল্পিত। মতলব হল, মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা।”
২৮ ডিসেম্বর পিরোজপুরের দুমড়িতলা গ্রামে একই পরিবারের অন্তত পাঁচটি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আটজন কোনোভাবে টিন কেটে বেরিয়ে আসতে পারলেও গবাদিপশু পুড়ে মারা যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ঘরের বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন লাগানো মানে এসব নিছক অগ্নিসংযোগ নয়—এগুলো গণহত্যার চেষ্টা।
খ্রিস্টানদের ওপর হুমকি
বাংলাদেশের প্রায় ১ শতাংশ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে ঢাকার সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রালের কাছে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ডিসেম্বরের ২ তারিখ ঢাকার কয়েকটি ক্যাথলিক কলেজে চিঠি দিয়ে হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের বিশপ সেবাস্তিয়ান টুডু বলেন, “চারদিকে ভয়। আমরা হুমকির মধ্যেই আছি।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটি এক অস্থির সময় পার করছে। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই সময়টিতে উগ্র গোষ্ঠীগুলো আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন।
“সহানুভূতি নয়, বিচার চাই”
সংখ্যালঘু নেতারা বলছেন, বিবৃতি নয়—প্রয়োজন কার্যকর বিচার ও সুরক্ষা।
মণীন্দ্র নাথ বলেন, “বিচার না হলে সহিংসতা নীতিতে পরিণত হয়।”
ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচিতে স্বজন হারানো মানুষেরা বলেন—তারা আর শুধু আশ্বাস চান না।
একজন হিন্দু শিক্ষক বলেন, “এখন বুঝেছি—আমাদের জীবন কিছু মানুষের কাছে কিছুই না, শুধু আমাদের ধর্মের কারণে।”
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র সতর্ক করে বলেছে, অপরাধীদের শাস্তি না হলে এই সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার সংকটে পরিণত হবে।

