বাঙালির রাষ্ট্রতত্ত্ব ও আদর্শিক স্ববিরোধিতার ট্র্যাজেডি

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও কেন একাংশ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মচেতনা মেনে নিতে পারেনি!

পাকিস্তান নামক একটি কৃত্রিম রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। ভারতের তৎকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি ভূখণ্ডের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, ১৯০৫ সালেই বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ শাসনামলে নিজেদের জন্য পৃথক একটি প্রদেশ চেয়েছিলেন, যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নামে পরিচিত। পরবর্তীতে তৎকালীন শিক্ষিত ও লিবারেল গোষ্ঠীর প্রবল আন্দোলনের মুখে সেই বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।

১৯৪৭ সালে ধর্মকে ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও বাঙালি জাতি সেই কৃত্রিমতাকে কখনো মেনে নেয়নি। তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ‘৬ দফা’র প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। এর চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের এক রক্তক্ষয়ী ও অমানবিক যুদ্ধ। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং অগণিত মানুষের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা লাভ করি স্বাধীন বাংলাদেশ। এই বীর শহীদেরা কেবল একটি ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং চারটি মূল স্তম্ভের (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) ওপর ভিত্তি করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

দস্তগীর জাহাঙ্গীর

কিন্তু চরম পরিহাসের বিষয় হলো, স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে যে, বাঙালিদের একটি বড় অংশ এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। পাকিস্তানের নাগরিকরা তাদের রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনার সাথে কোনো বিরোধ রাখে না, অথচ বাংলাদেশের একটি গোষ্ঠী এদেশের জন্মের আদর্শিক স্তম্ভগুলোকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবকে তারা প্রাপ্য শ্রদ্ধা দিতে ব্যর্থ হয়। এটাই পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক মৌলিক তফাৎ—পাকিস্তানিরা তাদের কৃত্রিম দেশকেও ভালোবাসে, আর এদেশের এক শ্রেণির মানুষ নিজের দেশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করতেই যেন বেশি ভালোবাসে।

আওয়ামী লীগ এদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েও ১৯৭৫ সালে ষড়যন্ত্রের কারণে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। দীর্ঘ সময় পর আবারও ক্ষমতায় এসে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করে তারা প্রতিটি সূচকে দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন করেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই মহাযজ্ঞ সত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—সশস্ত্র বাহিনী, আমলাতন্ত্র কিংবা বিচার বিভাগ—কোথাও আদর্শিক আনুগত্য বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এটি একটি চরম ট্র্যাজেডি।

এই পরিস্থিতি আমাকে আফগানিস্তানের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আফগান সমাজ রাজতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে তারা আধুনিক সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে ধর্মীয় উগ্রবাদী ব্যবস্থাকেই আঁকড়ে ধরেছিল, যার চরম খেসারত আজ পুরো আফগান জাতিকে দিতে হচ্ছে। আজ বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ যেন সেই একই উগ্রবাদী ভাইরাসে আক্রান্ত। যখন কোনো জাতি তার জন্মের ইতিহাস এবং মূল চেতনাকে অস্বীকার করে, তখন সেই অন্ধকারের গহ্বর থেকে নিষ্কৃতির পথ ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে আসে।

লেখক: দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সম্পাদক, দি ভয়েস। 

spot_img