ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে হস্তক্ষেপের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে ইরানে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেল

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দেশটিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই বক্তব্যকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কড়া অবস্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

শুক্রবার ভোরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান সরকার যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের “উদ্ধারে এগিয়ে আসবে”। তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”—অর্থাৎ যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন ইরানে টানা ছয় দিন ধরে চলা বিক্ষোভে একাধিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

অর্থনৈতিক সংকট থেকে বিস্ফোরণ

ইরানে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের মূল কারণ দেশটির ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইরানের মুদ্রা রিয়াল মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতির হার ৪০ শতাংশের বেশি।

প্রথমে বড় শহরের ব্যবসায়ী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ছোট শহর ও প্রাদেশিক এলাকাগুলোতে। বিক্ষোভকারীরা “স্বৈরশাসকের পতন চাই” এবং “অধিকার আদায়ে কণ্ঠ তুলুন”—এমন স্লোগান দিতে থাকেন।

প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের অভিযোগ

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। কয়েকটি শহরে পুলিশ স্টেশন ও সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। যদিও সব মৃত্যুর খবর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরে তৈরি অস্ত্র ও পেট্রল বোমা উদ্ধারের দাবিও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি ও সেনা “বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে” পরিণত হবে।

আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ও শীর্ষ নেতা আলি লারিজানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং এতে মার্কিন স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি দাবি করেন, “এই দুঃসাহসিক অভিযানের সূচনা করেছেন ট্রাম্প নিজেই।”

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরানের জনগণ নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করবে এবং কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।

ইরানে অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে শুরু হওয়া তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে বিভিন্ন প্রদেশে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। (২ জানুয়ারি ২০২৬)

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ইসরায়েলের ভূমিকা

এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চাপ বাড়িয়েছে। কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সম্প্রতি ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–র সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ইরান যদি আবার পারমাণবিক বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করে, তবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেবে।

ইসরায়েলের একাধিক মন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তারা ইরানের নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, জনগণের দাবিগুলো ন্যায্য।

বিক্ষোভকারীদের মনোবল ও অনিশ্চয়তা

ইরানের ভেতরে অনেক বিক্ষোভকারী মনে করছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য তাদের মনোবল বাড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে এতে প্রত্যাশাও বেড়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোরাসান প্রদেশের এক চিকিৎসক, যিনি নিরাপত্তার কারণে শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন, বলেন—ট্রাম্পের বক্তব্য আন্দোলনকারীদের সাহস জুগিয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি ওয়াশিংটন। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

প্রেসিডেন্টের স্বীকারোক্তি

এই পরিস্থিতিতে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক নরম সুরে কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, চলমান সংকটের জন্য দেশের শাসকরাই দায়ী। তিনি বলেন, “দোষ অন্য কারও নয়, আমাদেরই। জনগণ সন্তুষ্ট না হলে আমরা ব্যর্থ।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতেও ইরান সরকার কঠোর দমননীতি দিয়ে বিক্ষোভ দমন করেছে। তবে এবার অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আঞ্চলিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা একসঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। ট্রাম্পের “লকড অ্যান্ড লোডেড” মন্তব্য সেই অনিশ্চয়তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, যা যেকোনো ভুল হিসাবকে বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে।

spot_img