ধারাবাহিক হামলায় কাঁপছে বাংলাদেশের মিডিয়া ও সংস্কৃতি অঙ্গন

সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগে সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন

ঢাকা, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ — দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সংস্কৃতি অঙ্গন এবং নাগরিক সমাজে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সহিংস ঘটনাগুলোকে স্বাধীন সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও অধিকারকর্মীরা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।

হামলার সূচনা হয় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে, ১৮ ডিসেম্বর। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত দেশের প্রভাবশালী দুটি দৈনিক—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে একদল হামলাকারী ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চললেও কার্যকর কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি।

হামলার সময় দ্য ডেইলি স্টারের ভবনের ভেতরে সাংবাদিক ও কর্মীরা আটকা পড়েন। ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া সিঁড়ি ও করিডোর পেরোতে না পেরে অনেকেই ছাদে উঠে আশ্রয় নেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ক্রেন ব্যবহার করে অন্তত ২৮ জনকে উদ্ধার করেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই রাতে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ ঘটনার বর্ণনায় বলেন, “যখন তারা ভবনে আগুন দেয়, তখন ভেতরে থাকা কর্মীরা বের হতে পারেননি। তারা ছাদে উঠে যান এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে আটকে ছিলেন।”

হামলার সময় ভবনের ভেতরে থাকা সাংবাদিক জাইমা ইসলাম ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়ে সহকর্মীদের বার্তা পাঠান। পরে তিনি বলেন, “চারপাশে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। তখন মনে হচ্ছিল, আমরা হয়তো এখান থেকে বেরই হতে পারব না।”

এই হামলার ভয়াবহতায় দেশের সংবাদ জগতে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রথম আলো তাদের ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্ধারিত ছুটির দিন ছাড়া শুক্রবারের মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করতে পারেনি। একই সঙ্গে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকে তাদের অনলাইন সংস্করণ। দ্য ডেইলি স্টারও ৩৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। পত্রিকাগুলোর কর্মকর্তারা জানান, ভবনের ব্যাপক ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে সময় লাগবে।

প্রথম আলো এক বিবৃতিতে জানায়, “এটি একটি পরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা। আমাদের কর্মীদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।”

একের পর এক হামলা, তবু প্রতিরোধ নেই

পরদিন, ১৯ ডিসেম্বর রাতে, আবার হামলার ঘটনা ঘটে। এবার আগুন দেওয়া হয় দেশের অন্যতম প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। প্রথম রাতের হামলার পর দেশজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও, নতুন করে হামলা ঠেকাতে কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

সাংবাদিক ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, হামলাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে ঘটেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার হয়েছে। তবু তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ না থাকায় প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

এক যৌথ বিবৃতিতে সাংবাদিক সংগঠনগুলো জানায়, “হামলাগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলেছে, সবাই তা সরাসরি দেখেছে। তবু কার্যকর কোনো প্রতিরোধ না থাকায় আমরা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ পেয়েছি।”

এদিকে ধারাবাহিক হামলার পর ৩৬ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার বা তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং তদন্ত চলছে। তবে দৃশ্যমান কোনো ফল না থাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।

সরকারের বক্তব্য ও সমালোচনা

হামলার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস সংবাদপত্র দুটির সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেন বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়। তিনি এই ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন।

তাঁর প্রেস সচিব শফিকুল আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “সেই রাতে আমি সহায়তার জন্য কান্নাভেজা ফোনকল পেয়েছি। যা ঘটেছে, তা আমাকে গভীরভাবে লজ্জিত করেছে।”

তবে সমালোচকদের মতে, শুধু দুঃখ প্রকাশ বা নিন্দা যথেষ্ট নয়। দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের সহিংসতা আরও উৎসাহ পাবে।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও আঘাত

একই রাতে হামলার শিকার হয় দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। ধানমন্ডির ছয়তলা ভবনে শ্রেণিকক্ষ ভাঙচুর করা হয়, বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলা হয় এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম লুট করা হয়।

ছায়ানট তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানায়, “এই হামলায় ছায়ানট ভেঙে পড়বে না। ছায়ানট আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে এই ক্ষতি পূরণ করবে।”

সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “ছায়ানটের ওপর হামলা একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”

উদীচীর নেতা অমিত রঞ্জন দে বলেন, “যারা দেশকে অস্থিতিশীল করে পিছিয়ে নিতে চায়, তারাই এই হামলা চালিয়েছে।”

গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এসব হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতার লক্ষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, “আমরা এখন কার্যত এক ধরনের মব শাসনের লক্ষণ দেখছি। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গন এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। জরুরি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—রাষ্ট্র কি আদৌ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকাতে পারবে, নাকি এই সহিংসতার ধারাই নতুন বাস্তবতায় পরিণত হবে।

spot_img