বাংলাদেশে গত ১০ ঘণ্টায় নতুন করে সহিংসতা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এই অস্থিরতার তাৎক্ষণিক সূত্রপাত হয় তথাকথিত ‘জুলাই আন্দোলন’-নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীরা ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দিতে দিতে সড়ক অবরোধ, মিছিল ও হামলায় জড়ায়।
ঢাকায় সংবাদমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগ
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনের কাচ ভাঙচুর করে, অফিসের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ও নথিপত্র বাইরে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ডেইলি স্টারের ভবনের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে কিছু সময়ের জন্য কর্মীরা ভেতরে আটকা পড়েন বলে জানা যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং উদ্ধার তৎপরতা চালান।
সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই হামলা কেবল ভাঙচুর নয়—এটি গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি স্পষ্ট প্রচেষ্টা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার দৃশ্য সরাসরি প্রচার হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও অনেক ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ও ছায়ানট ভবনে হামলা
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে ধানমন্ডি এলাকাতেও। সেখানে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে আবারও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই সময়ে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ছায়ানট ভবনেও ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
ধানমন্ডি থানার ডিউটি অফিসার মিঠুন সিংহ ভয়েসকে বলেন,
“বিক্ষুব্ধ জনতা ছায়ানট ভবনে ভাঙচুর করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় বিক্ষোভকারীরা ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দিচ্ছিল।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সংগঠন ছায়ানট দীর্ঘদিন ধরে গান, নৃত্যসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে আসছে। এই সাংস্কৃতিক অবস্থানের কারণে দেশের বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ছায়ানটকে ‘ইসলামবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ঢাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ
ঢাকার শাহবাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে। ছাত্র সংগঠন ও আন্দোলনকারীরা মিছিল ও সমাবেশ করে। এই বিক্ষোভের ঢেউ ক্যাম্পাস ও সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
রাত গভীর হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়। তবে সমালোচকদের মতে, সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল ধীর, অসংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট—কিছু ক্ষেত্রে কঠোর হলেও সংগঠিত সহিংসতার বিরুদ্ধে তা কার্যকর ছিল না।
চট্টগ্রামে ভারতীয় কূটনৈতিক বাসভবনের কাছে হামলা
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে ভারতের সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনের কাছে হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এই হামলার পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়তে থাকা ভারতবিরোধী প্রচারণা ও গুজব ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু যুবককে পিটিয়ে হত্যা
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় একটি মর্মান্তিক ঘটনায় সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, ‘তাওহিদি জনতা’ পরিচয় দেওয়া একদল লোক ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করে। পরে তার দেহ গাছে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ভালুকা থানার ডিউটি অফিসার রিপন মিয়া ভয়েসকে বলেন,
“রাত ৯টার দিকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে আক্রমণ করা হয়। পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ গাছে বেঁধে আগুন দেওয়া হয়।”
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। এখনো মামলা হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ ও হামলা
রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। পাশাপাশি দেশের কয়েকটি মহাসড়ক অবরোধ করা হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
এই সহিংসতা এমন এক সময় ঘটছে, যখন ২০২৪ সালের আগস্টে নির্বাচিত সরকার অপসারণের পর বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী শাসনের অধীনে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকরা দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি, বেছে বেছে আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদমাধ্যম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়—এটি বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সামনে কী
ভোরের দিকে ঢাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন জনমনে তিনটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
- কারা এই হামলাগুলো সংগঠিত করেছে?
- উচ্চ নিরাপত্তা এলাকায় কেন আগেভাগে সহিংসতা ঠেকানো গেল না?
- এবং আদৌ কি প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা।

