রংপুরে মুক্তিযোদ্ধা হিন্দু দম্পতির নৃশংস হত্যা: সংখ্যালঘুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক

তারাগঞ্জে গলা কাটা অবস্থায় দম্পতির লাশ উদ্ধার—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায়

রংপুরের তারাগঞ্জে নিজের বাড়ির ভেতর থেকে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা হিন্দু শিক্ষক এবং তার স্ত্রীকে গলা কাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ভোররাতের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্থানীয়দের মধ্যে শোকের পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ দৃশ্য

রবিবার সকালে বহুবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীরা সন্দেহে বাড়িতে ওঠেন। মূল গেটটি ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তারা মই বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে যে দৃশ্য অপেক্ষা করছিল, তা যে কেউকেই স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো।

রান্নাঘরে পড়ে ছিলেন ৬০ বছর বয়সী সুবর্ণা রায়। ডাইনিং রুমে ছিলেন তার স্বামী ৭৫ বছরের জগেশ চন্দ্র রায়—মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা এবং স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। দু’জনের গলাতেই ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত।

প্রাথমিক ধারণা, রাত ১টার দিকে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। ঘরে তছনছের কোনো চিহ্ন নেই; চুরি-ডাকাতির ঘটনাও মনে হচ্ছে না। বরং লক্ষ্যভিত্তিক, দ্রুত এবং পরিকল্পিতভাবে দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে—এমনটাই মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

নিঃসঙ্গ জীবনে শান্ত, পরিশীলিত মানুষ

জগেশ চন্দ্র রায় ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, বিনয়ী এবং শিক্ষানুরাগী মানুষ। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও এলাকায় তাঁর সম্মান ছিল অপরিসীম। ২০১৭ সালে অবসর নেওয়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি।

দুই ছেলে পুলিশে কর্মরত হওয়ায় তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও দম্পতি বাড়িতে একাই থাকতেন। তাদের সঙ্গে কারও বিরোধ বা শত্রুতা ছিল বলে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি।

আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভয়াবহ উত্থান

শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর গত এক বছরে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগজনক উত্থান ঘটেছে। মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ব্যবসা লুট—এসব অভিযোগে হাজারো মামলা জমা পড়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে।

ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠেছে—রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিরপেক্ষ রাখা হয়নি; বরং রাজনৈতিক প্রতিশোধে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সংখ্যালঘুরা সুরক্ষা হারিয়েছে, এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলো সুযোগ পেয়েছে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার।

অনেকের মতে, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর এ ধরনের হামলা কেবল অপরাধ নয়—এটি বাংলাদেশে ঘৃণা-রাজনীতির উত্থানের ভয়াবহ ইঙ্গিত।

দায় চাপছে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর

নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এ ঘটনাকে সরাসরি “রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা” এবং “সংখ্যালঘুদের প্রতি নির্লজ্জ অবহেলা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেন, নির্বাচিত সরকারের পতনের পর থেকেই সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা—যিনি জাতির সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী—তার নিরাপত্তাও নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বারবার দাবি করছে, “সংখ্যালঘু হামলার ঘটনা অতিরঞ্জিত”—কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সেই দাবি প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

স্থানীয়দের আতঙ্ক: “আমরা তাহলে কোথায় নিরাপদ?”

তারাগঞ্জের মানুষ হতবাক। তারা বলছেন—যদি একজন সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা ও তার স্ত্রী নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ সংখ্যালঘু পরিবারগুলো কোথায় দাঁড়াবে?

মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে—দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত না হলে তারা কঠোর আন্দোলনে নামবে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় বলছে, এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে—বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের জীবন মোটেই নিরাপদ নয়।

সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা

এই হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র অপরাধ তদন্তের বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিচ্ছবি। মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের অভিযোগে এখন আরও একবার কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। মানুষ জানতে চায়—এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কি আদৌ হবে, নাকি অন্য অনেক ঘটনার মতো চাপা পড়ে যাবে?

spot_img
spot_img

Hot Topics

Related Articles