বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা তারকা সাকিব আল হাসান আবারও দেশে ফিরে একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যে বিদায়ী সিরিজকে ঘিরে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আনন্দ আর আবেগ থাকার কথা, সেটি এখন জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার জটিল বাস্তবতায়।
সম্প্রতি এক পডকাস্টে সাকিব জানান, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেননি। তার স্পষ্ট ভাষায়, শেষবারের মতো বাংলাদেশে একটি টেস্ট, একটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে চান—তারপরই অবসর। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের এমন আবেগঘন বিদায় যে কোনো দেশের জন্যই গর্বের হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ আর স্বাভাবিক নেই।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার সাকিব
সাকিব ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকার হটানোর পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় থেকেই সাকিব নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ যে কারও প্রতি বিদ্বেষের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে—এমন অভিযোগ শুরু থেকেই। সাকিবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সাকিবের অনুরোধ সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঢাকায় তার বিদায়ী টেস্ট আয়োজনের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। সরকারি পক্ষের দাবি—তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে, একমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ই তাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখার অজুহাত তৈরি করেছে।
একইভাবে আরেক জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মুর্তজার বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আতঙ্কের জন্ম দেয়। তিনিও এখন দেশের বাইরে জীবন বাঁচিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
খেলাধুলাও এখন রাজনীতির ছায়ায়
বাংলাদেশে ক্রিকেট সবসময়ই আবেগের জায়গা। কিন্তু এখন খেলাধুলাও রেহাই পাচ্ছে না রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়নের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিন লাখের বেশি মামলা, লাখ লাখ গ্রেফতার—এমন অবস্থায় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিবের নিরাপদ দেশে ফেরা নিয়ে উদ্বেগ এখন বাস্তবতা।
ক্রীড়াঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের প্রশ্ন নয়—এটা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। যে দেশে সবচেয়ে বড় তারকা খেলোয়াড়ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সেই দেশের সাধারণ মানুষের বাস্তবতা কী হতে পারে, তা আঁচ করা কঠিন নয়।
আশায় আছেন সাকিব—আশায় কোটি ভক্তও
এত বাধা-প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সাকিব নিয়মিত বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছেন। তার ভাষায়, “আমি আশাবাদী। মনে হয় হবে।” এই আশাই ধরে রেখেছেন দেশের কোটি ভক্ত।
সবাই অপেক্ষায়—কবে দেশের জার্সি পরে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন সাকিব, কবে তাকে সম্মান জানিয়ে স্টেডিয়াম ভরিয়ে তুলবে বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অপেক্ষা অনিশ্চয়তায় ঢাকা।
বিদায়ী সিরিজ কি আদৌ হবে?
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম সাকিব আল হাসান। তার বিদায় দেশের ক্রিকেটের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি জাতীয় আবেগেরও অংশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু রাজনীতির ঝড়ে সেই আবেগও হারিয়ে যাচ্ছে।
যতদিন না দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, ততদিন সাকিবের স্বপ্নও ঝুলে থাকবে অনিশ্চয়তার দোলনায়। আর ততদিন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার নিজের দেশ থেকে দূরে—একটি শেষ সিরিজের অপেক্ষায়।

