রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়বেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাকে নিয়মিতভাবে অপমান করেছে এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকে বারবার ছোট করেছে। এই মন্তব্য জনসমক্ষে আসার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ: “আমি থাকতে চাই না”
৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে গত কয়েক মাস ধরে তাঁর সঙ্গে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক ক্রমেই খারাপ হয়েছে।
রয়টার্সের সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “আমি পদ ছাড়তে চাই। নির্বাচন শেষ হলেই চলে যেতে চাই।”
তিনি জানান, দেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি এখনো দায়িত্বে আছেন, তবে মন থেকে থাকতে পারছেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে অপমানিত রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেন যে তাঁর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণ ছিল অশ্রদ্ধাপূর্ণ ও অবমাননাকর।
তিনি জানান: সাত মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর সঙ্গে কোনো বৈঠক করেননি। তাঁর প্রেস উইং বা গণমাধ্যম বিভাগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এক রাতে হঠাৎ দেশের সব দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে ঝুলানো রাষ্ট্রপতির ছবি তুলে ফেলা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “ছবি সরিয়ে ফেলা মানে সাধারণ মানুষকে ভুল বার্তা দেওয়া—যেন রাষ্ট্রপতিকে অদৃশ্য করে দেওয়া হচ্ছে। আমি খুব অপমানিত বোধ করেছি।”
তিনি এ বিষয়ে লিখিতভাবে ইউনুসকে জানান। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাননি।
বৈধ সরকার পতনের পর রাষ্ট্রপতির বাড়তি গুরুত্ব
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে আন্দোলনের নামে চুড়ান্ত নৈরাজ্য ও সহিংসতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করে ভারত যাওয়ার পর থেকে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতেই সংবিধান বহির্ভূতভাবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা হয়। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতিই দেশের একমাত্র সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ।
স্বাভাবিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত আনুষ্ঠানিক। কিন্তু এই সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর মর্যাদাহানি দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির এই অভিযোগে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার নামে ক্ষমতা দখল করে তারা বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দুর্বল করে ফেলছে—এমন অভিযোগ মুখে মুখে।
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ প্রমাণ করে যে অন্তর্বর্তী সরকার একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিদের ও সাংবিধানিক পদের প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে, যা দেশের জন্য বিপজ্জনক বার্তা।
আগামী নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী পরিবেশকে নিজেদের পক্ষে সাজিয়ে নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে মাঠ থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। আর নির্বাচনী প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘোষণা দেশজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে তার একটি বড় উদাহরণ।
সাহাবুদ্দিনের মতো একজন সাংবিধানিক প্রধানের নিজ দপ্তরের অপমানজনক অবস্থা তুলে ধরে আগেভাগে পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটি শুধু একজন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়—এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
দেশ এখন অপেক্ষায় আছে—ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কত বড় প্রভাব ফেলে।

