বাংলাদেশে ‘বাউল’ শিল্পী গ্রেপ্তারে নতুন অস্থিরতা

বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের পর তাওহিদি জনতার সহিংসতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্বন্দ্ব ও নাগরিক সমাজের বিবৃতি। ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ঢাকা, বাংলাদেশ — বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’–এর অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কবি, শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন—২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশে এক নতুন ধরণের ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, আর তার সর্বশেষ শিকার এই জনপ্রিয় বাউল শিল্পী।

বাউল শিল্পীর গ্রেপ্তার ও অভিযোগ

মাদারীপুরে এক সংগীতানুষ্ঠানে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনা হয় আবুল সরকারের বিরুদ্ধে। একজন ইমামসহ পাঁচজন মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ—তিনি নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে মন্তব্য করে জনমত উত্তেজিত করেছেন ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন।

কিন্তু এরপর যা ঘটেছে, তা আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

তাওহিদি জনতার হামলা: আতঙ্কে শিল্পীসমাজ

গ্রেপ্তারের দু’দিনের মাথায় ‘মুক্তির দাবি’তে মানিকগঞ্জে বাউলদের সমাবেশে হামলা চালায় ‘তাওহিদি জনতা’ ব্যানারে উগ্র ইসলামপন্থী একদল যুবক। অন্তত চারজন বাউল গুরু মারাত্মকভাবে আহত হন।

তাওহিদি জনতা—যারা গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একাধিক সুফি মাজার ভাঙচুর, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার ঘটনায় আলোচনায় আসে—এখন আরও সংগঠিত ও বেপরোয়া।

শিক্ষাবিদদের মতে, বাউলদের উদার, মানবতাবাদী দর্শন দীর্ঘদিন ধরেই উগ্রপন্থীদের চোখে ‘কুফরি’ হিসেবে বিবেচিত—এ জন্য তাদের ওপর হামলা বাড়ছে।

একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন— “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিসর দখলের একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।”

উগ্রবাদীরা বাউল শিল্পীদের গণপিটুনি দেওয়ার পর পুলিশ বাউল শিল্পীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

নাগরিক সমাজের বিবৃতি

সোমবার দেশের ২৫০ জনেরও বেশি প্রখ্যাত নাগরিক এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন— “জুলাই মাসের গণআন্দোলনের পর ধর্মীয় উগ্রবাদ ভয়াবহভাবে বেড়েছে।”

তাদের অভিযোগ, একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের ‘ইসলামের একমাত্র রক্ষক’ দাবি করে দেশজুড়ে একধরনের শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছে।

বিবৃতিতে তুলে ধরা হয় ভয়াবহ কিছু তথ্য—

  • ২০০টিরও বেশি সুফি মাজার ভাঙচুর
  • বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘মুরতাদ-কাফির’ ঘোষণা
  • মৃতদেহ কবরে ঠেকাতে হামলা
  • রাস্তায় বাউল-ফকিরদের চুল কেটে দেওয়া
  • নারীদের পোশাক, চলাফেরায় হামলা-বাধা
  • নৃত্য-গান-নাটক-মেলা-খেলাধুলায় বাধা
  • বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকায় পাহারাবাহিনীর মতো ‘চেকপোস্ট’ বসানো

বিবৃতিতে বলা হয়— “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখছে না; বরং নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর গভীর উদ্বেগ

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে—এসব ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিপন্ন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়— “ধর্মীয় সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এক উদ্বেগজনক শত্রুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

অবস্থা বুঝে ইসলামী মৌলবাদীদের অন্যতম আইডল ফারহাদ মজহারও আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি বলেন—
“ওনাকে গ্রেপ্তার মানে আমাকে গ্রেপ্তার। আমি এটা মেনে নেব না।”

তার অবস্থান বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কারণ তার স্ত্রী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য; এই বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়।

সরকারের অবস্থান—দ্বিধা, নীরবতা ও সমালোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুকে লেখেন— “অত্যন্ত সংবেদনশীল এ পরিস্থিতি সরকার দায়িত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করছে।”

তবে তিনি আরও বলেন, বাউল নিপীড়ন নতুন নয়—আগেও বিভিন্ন সরকারে হয়েছে। এ বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। অনেকেই বলেছেন, ধিক্কার জানানো যথেষ্ট নয়—যখন হামলাকারীরা প্রকাশ্যে, দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়।

বাউল ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়

বাউলরা বাংলাদেশের আত্মা—যাদের গান, দর্শন, মানবতাবাদ ও সাম্যের ভাবনা ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্য।

বহু সাংস্কৃতিক গবেষক এখন বলছেন— “এ লড়াই কেবল এক শিল্পীর নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার লড়াই।”

দেশ কোন পথে যাচ্ছে?

২০২৪–২৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশজুড়ে যে উগ্রবাদী প্রবণতা বাড়ছে, তার মধ্যে বাউলদের ওপর হামলা যেন আরেকটি কঠিন সতর্কতা। শিল্পী-শিক্ষক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বলছে— যদি সরকার দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে বাংলাদেশ তার বহুত্ববাদী পরিচয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

এখন অপেক্ষা—সরকার কি কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, নাকি নীরবতা ও দ্বিধার মধ্যেই উগ্রবাদীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

spot_img