ব্রিটিশ আইনজ্ঞদের উদ্বেগ: ঢাকায় টিউলিপ সিদ্দিকের বিচার “অন্যায়, সাজানো ও মতলবী”

লন্ডনের বিশিষ্ট ব্যারিস্টার ও সাবেক মন্ত্রীরা বলেন—যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ সিদ্দিক ন্যায়বিচারের সুযোগ পাচ্ছেন না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই মামলার ভিত্তি।

লন্ডন ও ঢাকা—বাংলাদেশে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলমান মামলাকে “সাজানো, অন্যায় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বহু দূরে থাকা” বলে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা আইনবিদ, ব্যারিস্টার ও সাবেক মন্ত্রীদের একটি প্রভাবশালী দল। তাদের মতে, এই বিচার রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ এবং এতে ন্যূনতম আইনি নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার সুযোগও নেই।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী ও খ্যাতিমান ব্যারিস্টার চেরি ব্লেয়ার, সাবেক ব্রিটিশ বিচারমন্ত্রী স্যার রবার্ট বাকল্যান্ড, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ডমিনিক গ্রিভসহ যুক্তরাজ্যের একাধিক কিংস কাউন্সেল (KC)। সোমবার সন্ধ্যায় চিঠিটি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

“ন্যায্য বিচার তো দূরের কথা— আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগই নেই”

চিঠিতে বলা হয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিককে অভিযোগের বিস্তারিত জানানো হয়নি, তিনি নিজের দেশে থেকেও কোনোভাবেই আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেননি, আর তার পক্ষে যিনি আইনজীবী নিয়েছিলেন, তাকেও নাকি গৃহবন্দি করে চাপ দেওয়া হয়েছে—যা আইনের শাসনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আইনবিদেরা লিখেছেন, “তিনি পলাতক নন, সংসদ সদস্য হিসেবে প্রকাশ্যে দায়িত্ব পালন করছেন এবং চাইলে যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় তাকে প্রত্যর্পণও করা সম্ভব। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে অনুপস্থিতিতে, কোনো প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই। এই পুরো প্রক্রিয়া প্রহসনের মতো।”

তাদের দাবি, টিউলিপের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ যেভাবে বাড়ছে, তাতে মামলার ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে গভীর সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

পটভূমি: হাই-প্রোফাইল মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে টিউলিপ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজি ও লেবার পার্টির জনপ্রিয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করা হয়, তাঁর মাকে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় একটি প্লট পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ‘প্রভাব খাটিয়েছিলেন’।
যুক্তরাজ্যের নীতিনৈতিকতা উপদেষ্টা তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ পাননি। বরং রিপোর্টে বলা হয়, “তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলেনি।”
তবুও বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ তোলে এবং টিউলিপের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়।

কিন্তু মামলার আরও বড় রাজনৈতিক মাত্রা তৈরি হয় যখন গত সপ্তাহে শেখ হাসিনাকে একটি বিতর্কিত বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে টিউলিপের বিরুদ্ধে বিচারকে অনেকেই একই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে দেখছেন।

বাংলাদেশে আইনজীবীর ওপর চাপ, মামলায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ

ব্রিটিশ আইনজ্ঞদের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে—টিউলিপ যে আইনজীবীকে বাংলাদেশে নিযুক্ত করেছিলেন, তিনি নাকি হঠাৎই মামলার দায়ভার ছাড়তে বাধ্য হন। অভিযোগ রয়েছে তাকে গৃহবন্দি রাখা হয়েছিল এবং তার মেয়েকে নিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

চিঠিতে বলা হয়, “এমন পরিস্থিতিতে কোনো বিচারই স্বাধীন ও স্বচ্ছ হতে পারে না। এ ধরনের ভয়-ভীতি সৃষ্টি বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।”

আইনবিদেরা আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা ও দায়িত্বশীল সংস্থা গণমাধ্যমে বারবার মন্তব্য করে টিউলিপকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন—যা বিচারকে আরও পক্ষপাতদুষ্ট করে তুলছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিচার—উদ্বেগ বাড়ছে

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে শুরু হওয়া এই বিচার নিয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে—রাজনৈতিক পক্ষপাত, হুমকি-ধমকি, এবং আইনজীবী ও গণমাধ্যমের ওপর নজরদারি এখন নিয়মিত ঘটনা।

ব্রিটিশ আইনবিদেরা দাবি করেছেন, “পুরো প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ওপর দাঁড়ানো। আন্তর্জাতিক মানের ন্যায্য বিচার এখানে অনুপস্থিত।”

রায়ের অপেক্ষায় লন্ডন–ঢাকা

টিউলিপ বর্তমানে তার নির্বাচনী এলাকা হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেটে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশে মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা হতে পারে—যা দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশ হাইকমিশন এখনো এ অভিযোগগুলোর আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।

spot_img