লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির পুনর্জাগরণ: বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা ভাবনায় নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বহু বছর ধরে অচল পড়ে থাকা লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়ায় ভাসছে নতুন নতুন প্রতিবেদন ও সমালোচনা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত এই বিশাল এয়ারফিল্ডে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক উন্নয়নকাজ দুই দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।

বিশেষ করে এর অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘সিলিগুড়ি করিডর’ থেকে খুব কাছেই হওয়ায় বিষয়টি আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

Also Read: Lalmonirhat Airbase Upgrade Near Siliguri Corridor Sparks Concern

নতুন হ্যাঙ্গার, বর্ধিত টহল, বাড়তি নজরদারি

উপগ্রহচিত্র, স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ বলছে—লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে বড় আকারের একটি হ্যাঙ্গারের নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। কংক্রিট ফ্লোর বসানোর কাজ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে ভবিষ্যতে এখানে মাঝারি আকারের পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার, নজরদারি ড্রোন কিংবা যুদ্ধবিমান রাখার সক্ষমতা তৈরি করা হবে।

বিমানঘাঁটির একটি বড় অংশে নতুন ফ্লাডলাইট বসানো হয়েছে, যা রাতের বেলায় পুরো সীমান্তঘেঁষা এলাকা আলোকিত রাখছে। পাশাপাশি বিমানবাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘণ্টা টহলে রাখা হয়েছে। ১১৬৬ একর বিস্তৃত এই স্টেশনের চার কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়ে জুড়েই এখন নিয়মিত সতর্ক নজরদারি চলছে।

সীমান্তের কাছে কৌশলগত অবস্থান

লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির দূরত্ব ভারতের কোচবিহার সীমান্ত থেকে ২০ কিলোমিটারেরও কম। আর সিলিগুড়ি করিডর—যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে আট উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে—সেখান থেকে দূরত্ব প্রায় ১৩০–১৪০ কিলোমিটার। ভৌগোলিক বিস্তারে জায়গাটি এতটাই সংকীর্ণ যে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এটি ভারতের “Achilles’ heel”।

এই এলাকায় নতুন সামরিক কাঠামো গড়ে ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নজর বেড়েছে। সিলিগুড়ি শহরে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছেন। ভারত এদিকে নিজেদের পক্ষ থেকেও প্রতিরক্ষায় জোরদার করছে—চোপড়া (উত্তর দিনাজপুর), বামুনী (ধুবড়ি, আসাম) ও কিশনগঞ্জ (বিহার) এলাকায় নতুন তিনটি সেনা ঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

ঝুঁকি না আধুনিকায়ন—দুই পক্ষেরই প্রশ্ন

বাংলাদেশ এখনো এই বিমানঘাঁটির ভবিষ্যৎ অভিযান বা অবস্থান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এটি বিমানবাহিনীর আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়ানো, সীমান্তে নজরদারি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উত্তরাঞ্চলে বড় কোনো এয়ারবেস এতদিন ছিল না—এই বাস্তবতায় হ্যাঙ্গার নির্মাণ ও অবকাঠামো সংস্কারকে তারা স্বাভাবিক সামরিক উন্নয়ন হিসেবেই দেখছেন।

অন্যদিকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা—আজ যা কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো, ভবিষ্যতে তা বহিরাগত শক্তির সহযোগিতায় আক্রমণাত্মক সক্ষমতায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ভারত-চীন টানাপোড়েনের সময়ে সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে কোনো সামরিক ঘাঁটির পুনর্জাগরণ অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

ভারতের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, চীনের আগ্রহ বা কারিগরি সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে দিল্লির সতর্কতা আছে। যদিও ঢাকা ও বেইজিং—দু’দেশের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলেনি।

ইতিহাসের পাতা থেকে আবার সামরিক মানচিত্রে

১৯৩১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত লালমনিরহাট ছিল একসময় এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এয়ারফিল্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্মা অভিযানে মিত্রবাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ছিল এটি। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারায়।

আজ বহু বছর পর আবারও সেই পুরনো ঘাঁটিতে প্রাণ ফিরে আসছে—যার কূটনৈতিক, কৌশলগত এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশই নীরবে বিশ্লেষণ করছে।

কী হতে পারে আগামীতে?

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর:

• ঘাঁটিটি কি পরিবহন, নজরদারি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সীমিত থাকবে, নাকি যুদ্ধবিমান ও স্ট্রাইক-ড্রোনের মতো আক্রমণাত্মক সক্ষমতা পাবে?
• ঢাকা ও দিল্লি কি পারস্পরিক স্বচ্ছতা ও আস্থা গড়ে তুলবে—নাকি সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা বাড়বে?
• কোনো বহিরাগত শক্তির সামরিক উপস্থিতির ইঙ্গিত কি পাওয়া যাবে?

যদি ঘাঁটি মূলত মানবিক সহায়তা, সীমান্ত নজরদারি এবং সামরিক প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে সময়ের সঙ্গে তা ভারতের কাছে স্বাভাবিক উন্নয়ন হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। তবে আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বা বিদেশি সহযোগিতা যুক্ত হলে এটি দুই দেশের সম্পর্কের নাজুক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

একসময় ইতিহাসের পাতা হয়ে থাকা লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি আবারও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রে। রানওয়ের আলো জ্বলে ওঠা, নতুন হ্যাঙ্গারের কংক্রিটের মেঝে শুকানো—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই ঘাঁটির উন্নয়ন এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক আস্থা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারও বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

spot_img