বাংলাদেশি অভিযাত্রী মোহাম্মদ আহসানুল হক খান্দকার আবারও এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করলেন—নেপালের হিমালয়ে মেরা পিক সেন্ট্রাল (৬,৪৬১ মিটার) জয় করে। প্রচণ্ড ঝড়, তুষারপাত আর শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা—সব বাধা জয় করে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেন।
গত ৫ নভেম্বর সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তিনি শীর্ষে পৌঁছান। শীর্ষে উঠার শেষ রাতের আরোহনে তাঁকে লড়তে হয়েছে প্রবল বাতাস আর তুষারঝড়ের সঙ্গে। পরে তিনি জানান, “এটা ছিল এক নির্মম পরীক্ষা। কিন্তু চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশের পতাকা তুললাম, তখন সমস্ত কষ্টই সার্থক মনে হয়েছে।”
অফিস টেবিল থেকে হিমালয়ের পথে
মাত্র পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত আহসানুল ছিলেন এক কর্পোরেট পেশাজীবী। ঢাকার ব্যস্ত জীবনের পর এক সময় তিনি খুঁজে পান পাহাড়ের স্বাধীনতা। প্রথমে দেশের ভেতরেই তিনি শুরু করেন অভিযান—বান্দরবানের পাহাড়ে ওঠা দিয়েই।
এরপর ২০২০ সালে তিনি পা রাখেন নেপালে। একে একে সম্পন্ন করেন অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প, মার্দি হিমাল, আর অন্নপূর্ণা সার্কিট—প্রত্যেক অভিযানে নিজেকে আরও শক্ত ও দৃঢ় করে তোলেন তিনি।
২০২৩ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম পর্বতারোহী হিসেবে শীতকালে ইয়ালা পিক (৫,৫২০ মিটার) জয় করেন। সেটিই ছিল তাঁর সহনশক্তি ও মানসিক দৃঢ়তার এক বিশাল পরীক্ষা। এবার মেরা পিক জয় তাঁর অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়।
তিনি বলেন, “কর্পোরেট জীবনে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারতাম না। কিন্তু পাহাড়ে উঠলে মনে হয় জীবিত আছি।”
ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমেও থামেননি
এই বছর নেপালের শরৎকালীন অভিযানের মৌসুমকে বলা হচ্ছে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক মৌসুমগুলোর একটি। সম্প্রতি তুষারধসে অন্তত সাতজন পর্বতারোহীর মৃত্যু হয় হিমালয়ের অন্য প্রান্তে। হঠাৎ তাপমাত্রা পতন, প্রবল বাতাস আর ঘন তুষারপাত অভিযাত্রীদের জীবনকে বিপন্ন করেছে।
মেরা পিকে অবস্থানরত এক শেরপা গাইড বলেন, “এ বছর পাহাড়টা যেন বাতাসের সুড়ঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। যারা চূড়ায় পৌঁছেছে, তারা সত্যিই অসম্ভব দৃঢ়সংকল্পিত।”
বাংলাদেশের পতাকা হিমালয়ের চূড়ায়
লুকলা–খারে–কোতে হয়ে প্রচলিত রুটে যাত্রা করেন আহসানুল। মেরা হাই ক্যাম্প থেকে শুরু করেন শেষ রাতের আরোহন। চূড়ায় পৌঁছে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে তিনি তাকিয়ে দেখেছেন চারপাশের হিমালয়ের রাজ্য—এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালু আর চো-ওইউ।
তিনি বলেন, “পাহাড় মানুষকে নম্র হতে শেখায়। বুঝতে শেখায় মানুষ কতটুকু সহ্য করতে পারে।”
নতুন লক্ষ্য এভারেস্ট
৩৬ বছর বয়সী আহসানুল ১৫ নভেম্বর ঢাকায় ফেরার কথা জানিয়েছেন। তবে তাঁর যাত্রা এখানেই শেষ নয়—পরবর্তী লক্ষ্য বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট।
“যদি শারীরিক সক্ষমতা আর প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারি, তবে আমি এভারেস্টে উঠব,” দৃঢ় কণ্ঠে বলেন তিনি। “চূড়ায় পৌঁছানোই সব নয়; আসল অভিযাত্রা হলো নিজের ভেতরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা।”
বাংলাদেশের তরুণ অভিযাত্রী সমাজে আহসানুল এখন এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর আগে ওয়াসফিয়া নাজরীন, এম এ মুহিত, এবং নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন হিমালয়ের শিখরে। এখন আহসানুল সেই তালিকায় যোগ করলেন এক নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশি পতাকা যখন বারবার হিমালয়ের তুষারচূড়ায় উড়ছে, তখন বিশ্ব বুঝছে—এই তরুণ প্রজন্ম শুধু স্বপ্ন দেখে না, তা ছুঁয়েও ফেলে।

