বাংলাদেশের নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার “নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক কর্তৃত্ব হীন”। তাঁর অভিযোগ, সরকার চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ইসলামি দলগুলোকে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
দ্য উইক ম্যাগাজিনে লেখা এক প্রবন্ধে শেখ হাসিনা বলেন, “ইউনুস প্রশাসন উগ্রবাদী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। হিজবুত তাহরীরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো আবারও সমাজে প্রবেশ করছে, তারা কঠোর ধর্মীয় মতবাদ ও দমননীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “এই একই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোই ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান ক্যাফে হামলার জন্য দায়ী—একটি ভয়াবহ ও নৃশংস সন্ত্রাসী হামলা, যাদের আমরা দমন করতে জীবন বাজি রেখেছিলাম।”
‘অবৈধ ও অযোগ্য প্রশাসন দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে’
শেখ হাসিনা তাঁর লেখায় বলেন, “বাংলাদেশ আজ এমন এক প্রশাসনের অধীনে, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই, কোনো নির্বাচিত বৈধতা নেই, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যূনতম অভিজ্ঞতাও নেই।” তিনি অভিযোগ করেন, “একদল অগণতান্ত্রিক এলিট নিজেদের মধ্যে দেশ ভাগ করে নিচ্ছে। তারা গণতন্ত্রের নামে প্রতারণা করছে, আর সাধারণ মানুষ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত।”
অন্তর্বর্তী সরকারের বানানো জুলাই সনদকে তিনি আখ্যা দেন “সংবিধানবিরোধী এক কাগুজে পরিকল্পনা”, যা দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়। তাঁর ভাষায়, “সত্যিকার গণতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, যখন দেশ পরিচালনা করছে এমন একজন ব্যক্তি যার জনগণের ম্যান্ডেট নেই।”
‘দেশ আজ ভয় আর সহিংসতার বন্দী’
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা লিখেছেন, “খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসন্ত্রাস, লুটপাট, ছিনতাই—সবকিছু আজ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পায়, আর অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে শাস্তি ছাড়াই।”
তিনি বলেন, “ইউনুস সরকারের শুরুর সপ্তাহগুলোতেই হাজার হাজার হামলা হয়েছিল হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর। এখনও প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও উপাসনালয়, বাড়িঘর ও মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা লিখেছেন, “ইউনুস সরকারের আমলে নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে—২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ধর্ষণের ৪৪১টি ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের চেয়ে বেশি।”
‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শেখা সাহসই আমার শক্তি’
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা নিজের রাজনৈতিক যাত্রা ও পারিবারিক উত্তরাধিকারও তুলে ধরেছেন। “বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে রাজনীতি আমার রক্তে মিশে আছে,” তিনি লিখেছেন। “আমার বাবা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ও দমননীতি ভেঙে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তব করেছিলেন।”
তিনি উল্লেখ করেন, “১৯৭৫ সালে পিতার হত্যাকাণ্ড শুধু আমার পরিবারকেই নয়, পুরো জাতিকেই এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই জাতি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে, যেমনটা করেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়।”
‘অর্থনীতি বদলে দিয়েছিলাম আমরা’
শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের সাফল্যের প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা যখন ক্ষমতায় আসি, তখন অর্থনীতি ছিল দুর্বল, মানুষের মধ্যে আশাহীনতা, আর অবকাঠামো ছিল ভঙ্গুর। শৃঙ্খলা, কর্মনিষ্ঠা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে পরিণত করি।”
তিনি বলেন, “আমাদের জিডিপি ৪৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়—বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। এর কৃতিত্ব সাধারণ মানুষের, যারা শ্রম ও মেধা দিয়ে দেশ গড়েছে।”
“লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হয়েছে, নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অভাবনীয় উচ্চতায়। শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবায় ছিল অভূতপূর্ব অগ্রগতি,” যোগ করেন তিনি।
‘ধর্মনিরপেক্ষতা আজ হুমকির মুখে’
তিনি লেখেন, “যে বাংলাদেশ একসময় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, আজ সেখানে সাম্প্রদায়িকতা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। নারী, সংখ্যালঘু, সাংবাদিক—সবাই ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে আছে।”
“আমরা একসময় ছিলাম এক মানবিক দেশ, যে দেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল যখন কেউ দিতে চায়নি। আজ সেই মানবিক মূল্যবোধও হারিয়ে যাচ্ছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
‘বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যম আজ বন্দি’
হাসিনা অভিযোগ করেন, “বিচারব্যবস্থা আজ রাষ্ট্রনির্ভর এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট আইনজীবী ও বিচারকরা আদালত চালাচ্ছেন, ন্যায়বিচারের কোনো স্থান সেখানে নেই।”
“শত শত সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়েছে, অনেককে মিথ্যা হত্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কিছু সাংবাদিক একাকী সেলে বন্দি, আইনজীবীর সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না,” তিনি লিখেছেন।
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন বিরোধী দল দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি এক অবৈধ নাটক, যার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপরাধী ঘোষণা করা।”
‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে’
প্রবন্ধে শেখ হাসিনা লেখেন, “বাংলাদেশকে আবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। কেবল তাতেই আমরা অতীতের প্রতারণা, বর্জন ও কারচুপির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করলে তা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ভয়াবহ নজির তৈরি করবে। এতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শই বিপন্ন হবে।”
“হাজারো নিরপরাধ আওয়ামী লীগ কর্মীকে মিথ্যা মামলায় আটক করা হয়েছে, শত শত মানুষ কারাগারে মারা গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে—এটাই আজকের বাংলাদেশ,” তিনি লিখেছেন।
‘ইউনুস সরকারের অভিজ্ঞতা নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই’
হাসিনা বলেন, “ইউনুস আসলে প্রশাসন পরিচালনার যোগ্য নন। তাঁর অভিজ্ঞতার অভাব আজ সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, জনসেবা অদৃশ্য, আর মানুষ দিশেহারা।”
“তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নাটক করছে, অথচ নিজেরাই তা ধ্বংস করছে। কিন্তু মানুষ বোকা নয়—তারা জানে বৈধতা কাকে বলে, আর এই সরকারের তা নেই,” তিনি মন্তব্য করেন।
শেষে শেখ হাসিনা লেখেন, “বাংলাদেশ এক গৌরবময় দেশ। আমরা গণহত্যা ও সামরিক শাসনের অন্ধকার পেরিয়ে এসেছি। এবারও ঘুরে দাঁড়াবো। আমি প্রার্থনা করি, আমার দেশ আবারও সত্যিকারের গণতন্ত্রে ফিরুক—যেখানে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে, ভয় ও সহিংসতা নয়, থাকবে ন্যায় ও মানবিকতা।”

