বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের মাত্রা আরও তীব্রতর করেছে। রাজধানী ঢাকায় ১৩ নভেম্বর দলের ঘোষিত “লকডাউন কর্মসূচি”র আগে নতুন করে সারাদেশে শত শত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ওপর যে ব্যাপক দমন অভিযান চালাচ্ছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ সালে ইউনুস প্রশাসন ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্তত ৪৪ হাজার ৪৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ধারণা, অক্টোবর থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অভিযানের মাত্রা আরও বেড়েছে, ফলে প্রকৃত সংখ্যা এখন ৫০ হাজারেরও বেশি।
এই সংখ্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দলকে দমন অভিযানের একটি। আওয়ামী লীগ, যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করেছিল, সেই দলের তৃণমূল নেটওয়ার্ককে ভেঙে দিতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে সংশোধিত নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করছে।
ঢাকায় সমন্বিত অভিযানে গ্রেপ্তার ৩১ জন
ঢাকা জেলার সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহার এলাকাজুড়ে বৃহস্পতিবার রাতে টানা অভিযানে ৩১ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মী।
পুলিশ জানিয়েছে, আটককৃতদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার শেখ রাসেল জাতীয় শিশু ও যুব পরিষদের সহকারী সম্পাদক রব্বি সরদার (২৫) রয়েছেন। তাকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে আটক করা হয়। পুলিশ দাবি করেছে, তিনি রাজধানীজুড়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিল পরিচালনা করছিলেন এবং তার ফোনে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, “আটকরা সকলে নাশকতা বা অরাজকতা সৃষ্টির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী যেকোনো কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
সারাদেশে গ্রেপ্তারের ঢেউ
ঢাকার পর কুমিল্লা, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলাতেও একযোগে অভিযান চলছে। কুমিল্লায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ফ্ল্যাশ মিছিল থেকে ৪৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ দাবি করেছে, ওই মিছিলের আড়ালে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল।
ঢাকা মহানগরের তেজগাঁও, খিলগাঁও, আগারগাঁও, বসুন্ধরা, ডেমরা ও লালবাগ এলাকায় আরও ছয়জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, রাজধানীতে ছোট ছোট ফ্ল্যাশ মিছিলের মাধ্যমে দলটি সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিল।
দমননীতির ধারাবাহিকতা
২০২৪ সালের আগস্টে সেনা ও ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠীর সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর তথ্যমতে, গত ১৪ মাসে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এর মধ্যে ১৯ জন গুলিতে নিহত, ১৪ জন নির্যাতনে, আর সাতজন হেফাজতে পিটিয়ে মারা গেছে। বিবিসি বাংলা ৩১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ সমর্থক বা সন্দেহভাজন অনুসারী।
একজন মানবাধিকারকর্মী মন্তব্য করেন, “দেশে কার্যত আইনের শাসন স্থগিত রয়েছে। এই সংখ্যাগুলোই রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের বাস্তবতা তুলে ধরে।”
১৯৭৫–এর ছায়া ফিরে এসেছে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে অতীতে সামরিক শাসন বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের নজির থাকলেও এত বড় পরিসরে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূলের চেষ্টা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগই দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেতনার মূল ধারক, যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনীতি ও মানব উন্নয়নের সোনালী যুগে পৌঁছেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭৫–এর পর সামরিক যুগের দমননীতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা ও দমন অভিযান চালানো হয়েছিল। আজও সেই একই কৌশল—দলবন্দি নিষেধাজ্ঞা, রাতের অভিযান ও তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তার—বাংলাদেশকে আতঙ্ক ও নীরবতার রাজনীতিতে ঠেলে দিচ্ছে।
ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি
কেরানীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পুলিশ ও ডিবির যৌথ দল রাতে হানা দিয়ে তরুণ নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের অনেকদিন পর্যন্ত আটক ব্যক্তিদের অবস্থান জানানো হচ্ছে না। গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—“নাশকতার প্রস্তুতি” বা “নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ”—যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট ও প্রমাণহীন।
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তারাও এখন হয়রানি, চাকরিচ্যুতি ও তদন্তের মুখে পড়ছেন যদি তাঁদের রাজনৈতিক সহানুভূতি আওয়ামী লীগের পক্ষে বলে সন্দেহ হয়।
জবাবদিহির অভাব ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো নিরাপত্তা কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি মিশন উদ্বেগ জানালেও এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়নি।
একজন সাবেক হাইকোর্ট বিচারপতি মন্তব্য করেছেন, “গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে হত্যার এ প্রবণতা রাজনৈতিক নির্মূল অভিযানেরই প্রতিফলন।”
সংকটের মোড়ে বাংলাদেশ
আসন্ন ১৩ নভেম্বরের “লকডাউন” কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় উত্তেজনা আরও বাড়ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে অটল থাকবেন। অন্যদিকে সরকার নিরাপত্তা জোরদার করছে এবং নতুন করে অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে—একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ঐতিহ্য, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভয়, নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছায়া।
দেশের সাধারণ মানুষ আশা করছে, এই দমন-পীড়নের অধ্যায় দ্রুত শেষ হয়ে বাংলাদেশ আবারও ফিরবে জনগণের অধিকার, শান্তি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে।

