বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন এক ঘৃণার ঝড় উদ্বেগ বাড়িয়েছে দেশজুড়ে। সম্প্রতি ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘#TMD’—অর্থাৎ “Total Maloun Death”—হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উস্কানিমূলক পোস্ট ভাইরাল হওয়ায় মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই অনলাইন ঘৃণা বাস্তব দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের ইমাম মহিবুবুল্লাহ মিয়াজীর নাটকীয় ‘নিখোঁজ হওয়া’কে কেন্দ্র করে। তিনি পরে স্বীকার করেন, নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণা শুরু হয়—যে ইমামকে নাকি অপহরণ করেছে হিন্দুরা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংগঠন ইসকন।
এই মিথ্যা প্রচারণাকে কেন্দ্র করে উগ্রবাদীরা শুরু করে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ক্যাম্পেইন। দেশজুড়ে ‘হিন্দু নিধন’ আহ্বান জানিয়ে অনলাইনে ছড়াতে থাকে ঘৃণামূলক পোস্ট, মিছিল-সমাবেশে উচ্চারিত হতে থাকে বিদ্বেষমূলক স্লোগান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #TMD হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভয়ানক ঘৃণা—যার পূর্ণরূপ “Total Maloun Death”, অর্থাৎ ‘সমস্ত মালাউন নিধন’।
ঐক্য পরিষদের উদ্বেগ প্রকাশ
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গতকাল (৮ নভেম্বর ২০২৫) এক বিবৃতি দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা লক্ষ্য করছি যে একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ফেসবুকে ‘#TMD’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়াচ্ছে। এতে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে, যা মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।”
ঐক্য পরিষদের মূল বিবৃতি (পিডিএফ)
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, অসংখ্য ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অশ্লীল, সহিংস ও ঘৃণামূলক পোস্ট ভাইরাল হচ্ছে, যার ফলে তরুণ ও ছাত্র সমাজের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা ছড়িয়ে পড়ছে এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাড়ছে।
ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, এই ধরনের প্রচারণা দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতাকে ভয়াবহ ঝুঁকিতে ফেলছে। তারা অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সরকার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কাছে এই প্রচারণা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে।
অনলাইনের ঘৃণা বাস্তবে ছড়াচ্ছে আতঙ্ক
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন মসজিদে শুক্রবারের খুতবায়ও হিন্দু বিরোধী বক্তব্য শোনা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক সূত্র জানিয়েছে। ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানোর এই প্রবণতা কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং গ্রামে-গঞ্জে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
ধর্মীয় সহাবস্থান ও আন্তঃসম্প্রীতি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আমিন বলেন, “গুজব ও ধর্মীয় উস্কানি বাংলাদেশে আগেও ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাস্তব দাঙ্গায় রূপ নেয়—এটা আমরা বহুবার দেখেছি।”
মানবাধিকার কর্মীদের সতর্কতা
ডিজিটাল বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরণের ঘৃণামূলক কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয় কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম উত্তেজনাকর ও বিতর্কিত বিষয়কে বাড়িয়ে তোলে। একবার পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেলে সেটি থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, “বাংলাদেশে অনলাইন ঘৃণার ইতিহাস রক্তাক্ত। রামু থেকে কুমিল্লা—প্রত্যেক ঘটনাই শুরু হয়েছিল ফেসবুকে মিথ্যা প্রচারণা দিয়ে। এই ধরণের হ্যাশট্যাগ কেবল কিবোর্ডের খেলা নয়, এটি মানুষের প্রাণহানির দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের দুর্বল অবস্থা
বাংলাদেশে একসময় জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায়; বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৮ শতাংশের নিচে। গত কয়েক দশকে তারা জমি দখল, উচ্ছেদ, হামলা ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে তাদের ওপর হামলার ইতিহাসও পুরনো।
বর্তমান ঘৃণার এই ঢেউ, বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই একই প্যাটার্নে গঠিত—একটি বানানো ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিকৃত উপস্থাপন, তারপর সংগঠিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উস্কানি।
কর্মপরিকল্পনা দাবি
ঐক্য পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, “একটি স্বাধীন দেশে যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান রয়েছে, সেখানে ধর্মবিদ্বেষী প্রচারণা কখনো কাম্য নয়। যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে এবং ধর্মীয় উস্কানি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
তারা সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন ঘৃণামূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এবং ফেসবুক-ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঘৃণার এই বন্যা রোধ করতে।
সংহতির আহ্বান
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন জড়িত দেশের নৈতিক ভিত্তির সঙ্গেই।
“বাংলাদেশকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা ঘৃণার সমাজ গড়ব নাকি সহাবস্থানের,” বলেন ইমতিয়াজ মাহমুদ। “সরকারকে শুধু নিন্দা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
গাজীপুরের এক প্রবীণ হিন্দু নাগরিকের কথায়, “এখন আমরা ভয় নিয়ে বাঁচি। মিথ্যা কথা দ্রুত ছড়ায়, আর সত্য হারিয়ে যায়।”
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বার্তা স্পষ্ট—ঘৃণা ছড়াতে দিলে তা সমাজকে গ্রাস করবে। সময়মতো ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা আবারও দাঁড়াবে অস্তিত্বের সঙ্কটে।

