বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনটিকে প্রথম দেখায় নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা—এ দেশের গণতন্ত্র বর্তমানে এমন এক পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ‘সংস্কার’ নামের মুখোশে গণতন্ত্রকেই ধীরে ধীরে দমিয়ে ফেলা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও তাদের বিদেশী সহযাত্রীরা যে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন’-এর কথা বলছেন, সেটি আসলে প্রতিনিধিহীন এক প্রক্রিয়া। জনগণের ভোটে নয়, প্রশাসনিক আদেশে তৈরি এই ব্যবস্থার ভিত গণতন্ত্র নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। আইআরআই’র প্রতিবেদনের ভাষা মৃদু হলেও, তার উপসংহার স্পষ্ট—বাংলাদেশের এই তথাকথিত সংস্কারপথ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে না, বরং দুর্বল করছে।
নির্বাচনের আগেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার খেলা
প্রতিবেদনটি প্রশংসা করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের তথাকথিত সংস্কার অভিযানের—১১টি কমিশন, ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশন’, আর ৮৪ দফা ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’। কিন্তু আইআরআই স্বীকার করেছে, এসব কিছুই এসেছে একদল অনির্বাচিত উপদেষ্টার হাতে থেকে। জনগণের কোনো অনুমোদন নেই, ভোটের ম্যান্ডেট নেই, অথচ তারা সংবিধান পরিবর্তনের নকশা আঁকছেন।
এই সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসীমা, সাংবিধানিক সংস্থা নিয়োগে নতুন কাঠামো—সবকিছুই শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ‘সংস্কার’-এর ভিতের ভেতরে আছে বিপজ্জনক এক উদ্দেশ্য—ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারগুলোর হাতে যেন প্রকৃত ক্ষমতা না থাকে। জনগণ যাতে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করলেও, প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা থেকে দূরে থাকে—এটাই এই কাঠামোর আসল অভিসন্ধি।
অর্থাৎ, যারা এখন ‘নিরপেক্ষ সরকার’ নামে রাষ্ট্র চালাচ্ছেন, তারা এমন এক কাঠামো তৈরি করছেন যেখানে ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচিত সরকারই আর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারবে না। এটি গণতন্ত্র নয়; এটি নিয়ন্ত্রিত শাসনের রূপরেখা।
সংস্কারের নামে নির্বাচনী অবরুদ্ধতা
আইআরআই প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি হলো অন্তর্ভুক্তির অভাব নিয়ে সতর্ক বার্তা। তারা বলেছে, বাংলাদেশে যদি প্রধানধারার রাজনৈতিক শক্তিকে—যে শক্তি স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছে—নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়, তবে সেই ভোট কোনোভাবেই “অংশগ্রহণমূলক” বা “বিশ্বাসযোগ্য” হবে না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের মতো সংগঠনকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রেখে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’-এর কথা বলছে। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক পরিহাস। বাংলাদেশের মতো দেশে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি মানে কেবল একটি দলের অংশগ্রহণ নয়—এটি স্বাধীনতার পক্ষের রাজনীতির উপস্থিতি।
আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দেওয়া মানে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রভূমি ফাঁকা করে দেওয়া। এর জায়গা পূরণ করছে ইসলামপন্থী দল ও কথিত নতুন মুখের তরুণ সংগঠন, যাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতাই সবচেয়ে ভয়াবহ—যেখানে গণতন্ত্রের নামে উগ্রবাদী রাজনীতি জায়গা নিচ্ছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার সামরিকীকরণ
আইআরআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন তাদের নিরাপত্তা কাঠামোয় সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করছে। এটিকে তারা ‘স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ কখনোই প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না।
একটি দেশে যেখানে সুশাসনের ভিত্তি বেসামরিক কর্তৃত্বের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে নির্বাচন পরিচালনায় সামরিক উপস্থিতি মানে সেই ভিত্তির দুর্বল হয়ে যাওয়া। গণতন্ত্র তখন নিরাপত্তার নামে নিয়ন্ত্রণের হাতে চলে যায়।
যেখানে নির্বাচনের মাঠে পুলিশ, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী—সবই একটি অরাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে চলে, সেখানে ভোট কেবল প্রক্রিয়া থাকে, জনগণের অংশগ্রহণ নয়।
সংস্কারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতারণা
জুলাইয়ের জাতীয় সনদটি শোনায় বড় ভালো লাগে—“নিরপেক্ষতা, বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা।” কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কে তৈরি করছে এই সনদ? নির্বাচিত সংসদ না কি বিদেশি অনুদান-নির্ভর উপদেষ্টা গোষ্ঠী? জনগণ কি জানে, এই ৮৪টি প্রস্তাবের ভেতরে আসলে কী আছে?
যদি এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, তবে এটিই প্রমাণ যে, এই সনদ আসলে জনগণের নয়। এটি এমন এক দলিল যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক করার বদলে বিদেশি পরামর্শদাতাদের তুষ্ট করতে তৈরি করা হচ্ছে।
আইআরআই’র পরোক্ষ বার্তা
আইআরআই কূটনৈতিক ভাষায় বললেও, তাদের বার্তা পরিষ্কার—বাংলাদেশে যদি আসন্ন নির্বাচন প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হবে।
প্রতিবেদনটি বলছে, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে অন্তর্ভুক্তির ওপর, স্বচ্ছতার ওপর, এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর। এর অর্থ একটাই—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হলে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এটি এক প্রকার কূটনৈতিক সাবধানবাণী। বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা চাইছেন, নির্বাচন যেন সত্যিকার অর্থে জনগণের হয়—কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়।
গণতন্ত্রের পথ একটাই — জনগণের কাছে ফেরা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শেখায়, সংস্কার যত বড়ই হোক, জনগণের ভোটের বিকল্প নেই। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে সংবিধান পর্যন্ত, সবকিছুই এক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে—জনগণের সার্বভৌমত্ব।
অতএব, যেকোনো সংস্কার, আইন বা কাঠামো তখনই অর্থবহ, যখন তা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে আসে। অনির্বাচিত উপদেষ্টারা গণতন্ত্রের স্থপতি হতে পারেন না। তারা কেবল জনগণের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করেন।
আজ বাংলাদেশকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি অংশগ্রহণমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গণতন্ত্রে ফিরে যাবে, নাকি “পরিচালিত সংস্কারের” ছদ্মবেশে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির পথে হাঁটবে?
আইআরআই’র প্রতিবেদন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—জনগণের অনুমোদনহীন সংস্কার কখনো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে না। বাংলাদেশকে আবারও ফিরে যেতে হবে সেই মূলনীতিতে, যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধের ভিত গড়েছিল—জনগণের অধিকার, জনগণের শাসন, জনগণের রাষ্ট্র।
লেখক: দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সম্পাদক, দ্য ভয়েস।

